সিএনজি চালক আব্দুল আলিম। সকাল সাড়ে ৬টার মহাখালী সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন লাইন। প্রায় আড়াই ঘন্টা পর তিনি গ্যাস পান ৪২ টাকার। সেই টাকার গ্যাস নিয়ে প্রথম ট্রিপ হিসেবে ৩শ’ টাকায় যাত্রী নিয়ে আসেন বনশ্রীতে।
যাত্রী নামানোর পর এফ জি এভিনিউ সিএনজি স্ট্যান্ডে পরবর্তী ভাড়ার জন্য দাঁড়ান। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে।
আব্দুল আলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর ৪২ টাকার গ্যাস দিয়ে কি করবো? এই একটা ভাড়া মেরেছি আর হয়তো একটা ট্রিপ দিতে পারবো। এরপর খোঁজ করে আবার গ্যাসের স্টেশনে দিতে হবে লাইন। তারপর গ্যাস নিতে অপেক্ষা করতে হবে ঘণ্টার পর ঘন্টা। এরপর আবার পাবো ৫০-৬০ টাকার গ্যাস। আবার হয়তো দুইটা ট্রিপ দিতে পারবো। এভাবে তো দিনের সময় শেষ। সিএনজির জমা ১২০০ টাকা। আমি তো জমাই উঠাতে পারবো না।” তাহলে আমি খাবো কি, পরিবার খাবে কি— এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শুধু আলিম নয়, রাজধানীর প্রতিটি সিএনজি চালকদের এখন এই অবস্থা। গ্যাস নিতে নিতে দিন পার। তারা সিএনজির মালিকের জমাই উঠাতে পারছেন না।
প্রাইভেট কার চালক ইউনুস বলেন, “ঘণ্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে ১০০-১২০ টাকার গ্যাস পাচ্ছি। আমার ১৫০০ সিসির একটা গাড়ি— যেখানে গ্যাস ওঠে ৬০০ টাকার সেখানে ১২০ টাকার গ্যাসে কতদূর যাবেন?”
তিনি বলেন, “মাসে ৩০ হাজার টাকার চুক্তিতে গাড়ি নিয়ে আমি রেন্ট-এ কার চালাই। এখন ১২০ টাকার গ্যাস নিয়ে আমি কিভাবে চলবো? আমার তো ভাড়া সব ঢাকার বাইরে। আর ঢাকার বাইরে ১২০ টাকার গ্যাস নিয়ে কতদূর যাওয়া যায়।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “গ্যাস সংকটের মধ্যে আমি তো কাঁচপুরই পার হতে পারছি না। তাহলে আমি কীভাবে চুক্তির টাকা দেবো আর কীভাবে সংসার চালাবো।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সংকটে পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীতে একদিকে যেমন সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সঙ্কট চলছে তেমনি চলছে বাসাবাড়িতেও। তীব্র গ্যাস সংকটে রাজধানীসহ সারাদেশে তৈরি হয়েছে এক প্রকার হাহাকার। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত পরিবহণ চালকরা। দিনের বেশির ভাগ সময়ই চালকদের কাটছে ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও থেকে যে গ্যাস মিলছে তা দিয়ে এক থেকে দুই ট্রিপও দিতে পারছে না। স্বল্পচাপের কারণে অনেক সিএনজি স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়—
মিরপুর: গাবতলী, কল্যাণপুর, কালশী, কাজীপড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার সিএনজি স্টেশন ঘুরে গাড়ির দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় স্টেশনগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশাকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে লাইন ধরে।
ডেমরা: ডেমরা এলাকায়ও একই অবস্থা। এতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য ২-৩ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় থাকতে হয় পরিবহণ চালকদের। প্রতিটি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। যাত্রী টানতে না পারায় রুজি-রোজগার ও পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বেশির ভাগ চালক। এদিকে গ্যাস বিক্রি কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশন মালিকদের।
সবুজবাগ: মুগদা, মানিকনগর, সবুজবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী ও হাজীপাড়া এলাকায় অন্যদিনের তুলনায় বেশি গ্যাস সংকট দেখা যায়। গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন। ফলে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় সিএনজিচালিত যানবাহন চালকদের। এ সময় অনেক ফিলিং স্টেশন গ্যাস নেই সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখতেও দেখা যায়।
উত্তরা: উত্তরায় গ্যাস সংকট ছিল তীব্র। গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ ছিল। আর যেসব স্টেশন চালু রাখা হয়েছিল, চাপ কম থাকায় সেগুলোতে তৈরি হচ্ছে পরিবহণের লম্বা লাইন।
রাসেল ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনে রেন্ট-এ-কার চালক মো. বশির হাওলাদার বলেন, “ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। দূরপাল্লার যাত্রী নিতে পারছি না। যাত্রী গাড়িতে রেখে এখন আর গ্যাস নেওয়া যায় না। কারণ ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে থাকতে হচ্ছে। আর এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।”
খন্দকার ফিলিং স্টেশন ম্যানেজার কামাল আহমেদ বলেন, “পরিবহণের বড় একটি অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় পরিবহণের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের কিছুই করার নেই।”
