কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো একসময় ছিল নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা লাখো মানুষের আশ্রয়স্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশ্রয়শিবিরের ভেতরেই এখন ঘনীভূত হচ্ছে নতুন এক আতঙ্ক। আধিপত্যের লড়াই, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, খুন, অবৈধ অস্ত্রের দাপট, মাদক কারবার, অপহরণ ও চাঁদাবাজি— বহুমাত্রিক অপরাধে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে ৩৩টি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প। গত সাড়ে ৬ বছরের হিসাব বলছে, এই ক্যাম্পগুলোতেই ঘটেছে ২৪৭টি হত্যাকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারির মধ্যেও থামছে না অপরাধচক্রের তৎপরতা।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, ক্যাম্পে এখন ১০টির বেশি সশস্ত্র ও অপরাধী চক্র সক্রিয়। নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘাতে জড়াচ্ছে এসব গোষ্ঠী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক ও অস্ত্রের কারবার, অপহরণ এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধ। ফলে দিন যত যাচ্ছে, ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ততই জটিল হয়ে উঠছে। এপিবিএনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে— এই পাঁচ মাসেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০২৫ সালে ২২, ২০২৪ সালে ৬২, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৭৪, ২০২২ সালে ৩৩, ২০২১ সালে ৩৩ এবং ২০২০ সালে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ক্যাম্পগুলোয় হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ছিল। আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন অপরাধচক্রের দ্বন্দ্বের জেরেই এসব হত্যাকাণ্ডের বড় অংশ ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
ক্যাম্পের অপরাধজগতের শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে অবৈধ অস্ত্র। গত সাড়ে ৬ বছরে অস্ত্রসহ ৫৮৪ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে এপিবিএন। এ ঘটনায় করা হয়েছে ৩৮৯টি মামলা। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫৩টি পিস্তল, ৪টি রিভলভার, ৩৯৫টি কাটা রাইফেল ও ১২টি সাময়িক রাইফেল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় ছোটখাটো বিরোধও অনেক সময় প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। শুধু অস্ত্র নয়, সীমান্তঘেঁষা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটও। গত সাড়ে ৬ বছরে মাদক-সংক্রান্ত ১ হাজার ৬৩৭টি মামলায় ২ হাজার ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা— ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯ পিস। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার গুঁড়া, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, গাঁজা, মদ ও বিয়ার।
ক্যাম্পের অপরাধ ও অস্থিরতার প্রভাব এখন আর উখিয়া ও টেকনাফে সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার মধ্যে শুধু এই দুই উপজেলায় রোহিঙ্গাদের বসবাস হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জেলায়। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাস— জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত জেলায় বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজার ৯৩৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৮টি। ২০২৫ সালে জেলায় প্রায় ৫ হাজার মামলা নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে ১৩৮টি ছিল হত্যা মামলা। হিসাব করলে দেখা যায়, জেলা জুড়ে প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ১৪টি মামলা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে এপিবিএনের অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ আগামীর সময়কে বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং যেকোনো সমস্যা সমাধানে এপিবিএন সদস্যরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। উখিয়া ও টেকনাফসহ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এপিবিএনের পাশাপাশি একাধিক টিম কাজ করছে।