Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ মামলায় তিন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে বিচার শুরু না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার সিদ্ধান্তে নিন্দা জানিয়েছে কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতি (সিজিএ)। সংগঠনটির দাবি, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে করা কাজকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক নজির তৈরি করছে।

সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতি বলেছে, সোমবার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের  জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ মামলায় তিন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে বিচার শুরু না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিজেএ আদালতের এই সিদ্ধান্তে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

কারাগারে থাকা তিন সাংবাদিক হলেন- ভোরের কাগজের সাবেক সম্পাদক ও কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতির সহসভাপতি শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একই টেলিভিশনের প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা।

সিজিএ বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটির অন্যতম বিষয়- ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন, যেখানে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করার সময় ‘উসকানিমূলক মন্তব্য’ করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে কোনো রাজনৈতিক নেতার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা এবং সেই প্রশ্ন যতই বিতর্কিত হোক না কেন-সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের মৌলিক অংশ। শুধু এ কারণে কোনো কাজকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ব্যবহার করে বিচার করা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেছে সিজিএ।

সংগঠনটির মতে, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে সাংবাদিকদের প্রকৃত অপরাধের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা যেতে পারে, তবে শুধু প্রশ্ন করা, ঘটনা প্রতিবেদন করা বা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে সাংবাদিকদের অপরাধী করা যাবে না।

সংগঠনটি বলেছে- শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপা ইতোমধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। মূল অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকা এবং নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মধ্যে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় অভিযোগপত্র দাখিল করতে ব্যর্থতার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, শ্যামল দত্ত হৃদরোগ ও গুরুতর ঘুমের সমস্যাজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, যার জন্য চিকিৎসা মূল্যায়ন ও চিকিৎসা প্রয়োজন। অন্যদিকে মোজাম্মেল হক বাবু ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রোস্টেট ক্যানসারের জন্য বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন এবং তার নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন বলে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতিতে তিন সাংবাদিককে কারাগারে আটকে রাখা আরও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।

সাংবাদিকতাকে যেন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা না হয় এবং সাংবাদিকরা যাতে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে শাস্তির শিকার না হন- তা নিশ্চিতে কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতি বাংলাদেশ সরকার ও বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিজিএ।

সংগঠনটি শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত পর্যালোচনা করার পাশাপাশি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের মানদণ্ড নিশ্চিত করে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলে তাদের মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো সরকারের দেওয়া বিশেষ সুবিধা নয়। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য শর্ত।

শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপার পাশাপাশি গ্রেপ্তার, কারাবাস বা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই শুধু নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে চাওয়া বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে সিজিএ।