আগুন জ্বলছিল গ্রামের পর গ্রামে। চারদিকে গুলির শব্দ। প্রাণ বাঁচাতে সন্তানদের হাত ধরে মানুষ ছুটছিল সীমান্তের দিকে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সেই রাতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৯ সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়েছিলেন জামাল হোসেন ও ছকিনা খাতুন। সাত দিন পাহাড়, জঙ্গল ও নদী পেরিয়ে তাদের ঠাঁই হয় কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থীশিবিরে।
এরপর কেটে গেছে ৯ বছর। ৯ সন্তান নিয়ে আসা সেই দম্পতির পরিবারে এখন সদস্য ১৪ জন। বাংলাদেশে জন্মেছে আরও তিন সন্তান। ১৫০ বর্গফুটের ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে তাদের বসবাস। কিন্তু শুধু জামালের পরিবার নয়, ৯ বছরে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে এভাবেই বড় হয়ে উঠছে একটি নতুন প্রজন্ম— যারা কখনো মিয়ানমার দেখেনি, অথচ বাংলাদেশও তাদের দেশ নয়।
আজ ২৫ আগস্ট, রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। ৯ বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। বরং ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে নতুন শিশু, বড় হচ্ছে পুরনো প্রজন্ম, কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং দীর্ঘ হচ্ছে অনিশ্চয়তার তালিকা। যে আশ্রয় ছিল সাময়িক, তা যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে স্থায়ী এক অপেক্ষায়।
গত ২৩ আগস্ট দুপুরে কুতুপালং ক্যাম্প-৩-এর ঘরে বসে জামাল হোসেন বলছিলেন, ‘মিয়ানমারে যখন ছিলাম, তখন ৯ সন্তান ছিল। বাংলাদেশে আসার পর আরও তিন সন্তান হয়েছে। পরিবার বড় হয়েছে, কিন্তু খাদ্য সহায়তা কমেছে। আয়েরও সুযোগ নেই। সংসার চালানো খুব কঠিন।’
পরিবারটি মাসে যে খাদ্যসহায়তা পায়, তা দিয়ে ১৪ জনের সংসার চলে না বলে জানিয়েছেন জামাল। মাসের শেষ দিকে জ্বালানি নিয়েও সংকটে পড়তে হয়। বড় ছেলে অসুস্থ, আরেক ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন, একজন সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। মেয়েদের কেউ বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন, কেউ পড়াশোনা ছেড়েছেন, কেউ এখনো ক্যাম্পের শিক্ষাকেন্দ্রে যায়।
জামালের মতোই ২০১৭ সালে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছিলেন মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। তখন তিনি তরুণ ছিলেন। এখন তার বয়স ২৮। ৯ বছর ধরে কাঁটাতারের ভেতরের জীবনই তার বাস্তবতা। কিন্তু তার দেশের নাম এখনো মিয়ানমার।
আরিফুল্লাহ বলছিলেন, ‘মিলিটারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলাম। সেই সময়ের কথা মনে পড়লে এখনো কান্না পায়। কিন্তু মিয়ানমারই আমার দেশ। একদিন সেখানে আবার ফিরতে চাই।’
রোহিঙ্গাদের বড় অংশের চাওয়াও একই। তারা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চায় না। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও নিজ ভূমিতে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের নিশ্চয়তা পেলে মিয়ানমারে ফিরতে চায়। কিন্তু সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এই দেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, জীবন বাঁচিয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীও আমাদের সহায়তা করছে। কিন্তু আমরা এখানে স্থায়ী নই। আমাদের একদিন নিজ দেশে ফিরতে হবে। রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র স্থায়ী সমাধান প্রত্যাবাসন।’
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তালিকা দেওয়া হয়েছে, পরিচয় যাচাইও হয়েছে। বাংলাদেশের পাঠানো তালিকা থেকে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে মিয়ানমার। তবু একজন রোহিঙ্গাও প্রত্যাবাসিত হননি।
কারণ, প্রশ্নগুলো এখনো একই জায়গায়। ফিরলে নিরাপত্তা মিলবে কি না, নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কি না, নিজেদের গ্রামে যাওয়া যাবে কি না, ফিরে পাওয়া যাবে কি না বাড়ি ও জমি— কোনোটিরই স্পষ্ট উত্তর নেই।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই ক্যাম্পে বদলে যাচ্ছে প্রজন্মের চেহারা। ২০১৭ সালে যারা শিশু ছিল, তাদের অনেকেই এখন তরুণ। আবার গত ৯ বছরে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশু কখনো মিয়ানমার দেখেনি।
ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে কীভাবে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা যাচ্ছে না। আগে সংঘাত বন্ধ হতে হবে।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চললেও প্রতি বছর ক্যাম্পে ২০ থেকে ৩০ হাজার নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। অর্থাৎ কাঁটাতারের ভেতর ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এমন একটি প্রজন্ম— যাদের জন্মের দেশ বাংলাদেশ নয়, আবার যে দেশকে তাদের নিজের বলা হয়, সেই মিয়ানমারও তাদের কাছে দেখা কোনো বাস্তবতা নয়।