Image description

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের বিচার শুরুর আগে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখার অবসান চেয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। ২৩ আগস্ট প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘বিচার শুরুর আগে রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা বন্ধ করুন’। এতে রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিন আটক রাখা, জামিন না দেওয়া, কারাগারে মৃত্যু, চিকিৎসাবঞ্চনা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন শেখ হাসিনা গত জুলাইয়ে প্রথমবার, চলতি আগস্টে আবারও দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি দেশে ফেরার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন। তার বিরুদ্ধে দেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ।

অনেকের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর এইচআরডব্লিউর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানবাধিকার নিয়ে তৎপরতা নতুন করে চোখে পড়ছে। পশ্চিমাদের ‘দোসর’ হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের আমলে এইচআরডব্লিউ অনেক বেশি সক্রিয়। তাই ইউনূস সরকারের আমলে সংগঠনটির তুলনামূলক নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ থেকেই নতুন সরকারের মানবাধিকার নীতি নিয়ে তারা সক্রিয়। ১৬ মার্চ এইচআরডব্লিউ নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রতি নির্বিচারে আটক বন্ধ, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।

এরপর মে মাসে সংস্থাটি গুমের ঘটনায় ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের আহ্বান জানায়। জুলাইয়ে তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয়। ১৯ জুলাই এইচআরডব্লিউ অভিযোগ করে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো নতুন একটি গুমের ঘটনা সামনে এসেছে এবং সরকার গুম প্রতিরোধে আগের সংস্কার উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে গেছে। ১৫ জুলাই এইচআরডব্লিউসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত বন্ধের দাবি জানায়। একই বিবৃতিতে সাংবাদিক শাকিল আহমেদ ও শ্যামল দত্তকেও মামলা থেকে মুক্তির আহ্বান জানানো হয়।

২৮ জুলাই এইচআরডব্লিউ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও পৃথক উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির উপএশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, কিন্তু অনেক মামলার বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না। সংস্থাটি অভিযোগ করে, কিছু মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে একই বক্তব্য হুবহু বা প্রায় হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে।

সেই ধারাবাহিকতার পর ২৩ আগস্টের প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ সরাসরি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দীর্ঘদিনের আটক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আটক করে। তাদের মধ্যে শত শত মানুষ এখনো কোনো অপরাধে অভিযুক্ত না হয়েই কারাগারে রয়েছেন। সংস্থাটি স্বীকার করেছে, শেখ হাসিনা সরকারের কিছু কর্মকর্তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের বক্তব্য, অনেককে বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অনেকের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা, দলটির সমর্থক ও সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর এবং বিভিন্ন ধরনের মব সহিংসতার ঘটনায় এইচআরডব্লিউ তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংস্থাটিকে দৃশ্যমানভাবে প্রতিবাদ জানাতে বা জোরালো বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের আটক, বিচার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরডব্লিউর তৎপরতা বেড়েছে।

তাদের আরও দাবি, ভারতের মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া চলছে। এই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবস্থানেও পড়ছে বলে তারা মনে করেন। তাদের ভাষ্য, পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থায়ন ও প্রভাববলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হিউম্যান রাইটস ওয়াচও সেই পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণের কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মানবাধিকার ইস্যুতে আগের তুলনায় বেশি সক্রিয় হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলছেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের আমলে শত শত বিরোধী সদস্যকে প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়েছে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; সেই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিনের ইচ্ছামতো আটক বন্ধ করা উচিত।

এইচআরডব্লিউর মতে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, শেখ হাসিনার প্রশাসনকে সমর্থন করা সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগপন্থী কর্মী, কর্মকর্তা ও সাংবাদিক যেমন রয়েছেন, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। তাদের কারও বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম ও অন্যান্য গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে; কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। অর্থাৎ সংস্থাটি সব আটক ব্যক্তিকে নির্দোষ বলছে না। অভিযোগের প্রমাণ, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া ও ব্যক্তিগতভাবে আটক রাখার প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের ওপর জোর দিয়েছে।

জামিনের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করা মামলাতেও রাষ্ট্রপক্ষ বারবার জামিনের বিরোধিতা করছে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে। নিম্ন আদালত ও জেলা আদালতগুলো নিয়মিত জামিন নাকচ করছে। উচ্চ আদালত জামিন দিলেও নতুন মামলা করে সেই আদেশ কার্যকর হতে দেওয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তিদের আইনজীবীরা তাদের জামিনের আবেদন না করার পরামর্শ দিচ্ছেন—কারণ জামিন পেলে পুলিশ নতুন মামলা করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে ৮২ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ঘটনা তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী তিন মাসে দুর্নীতিসহ আরও চারটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। প্রতিটি মামলায় নিম্ন আদালত তার জামিন নাকচ করেন। অথচ তার পরিবার এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছে, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কারাগারে থাকাকালে একবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন।

উচ্চ আদালত তার জামিন মঞ্জুর করলেও গত ১০ মার্চ একটি মামলায় জামিন পাওয়ার এক দিন আগে পুলিশ তাকে আরও দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। ওই দুই মামলাতেও নিম্ন আদালত জামিন নাকচ করেন। পরে ১২ মে উচ্চ আদালত জামিন দেন। কিন্তু মুক্তির আগেই পুলিশ তার বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা মামলা করে। ওই মামলায় দাবি করা হয়, আগের একটি হত্যার সময়ের সঙ্গেই একই সময়ে তিনি অন্য একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলেও ছিলেন। অথচ দুটি ঘটনাস্থলের দূরত্ব ১০ কিলোমিটারের বেশি। পরে আবারও উচ্চ আদালত জামিন দিলেও পুলিশ নতুন মামলা করে। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়েও এইচআরডব্লিউর উদ্বেগ আরও গভীর। সংস্থাটি বলেছে, অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় আটক রাখার সুযোগ কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ রয়েছে এবং সেই কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করার কথা। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত আটক করা ১৬০ জনের বেশি কাউকেই জামিনে মুক্তি দেননি। উপরন্তু, জামিন নাকচের বিরুদ্ধে তাদের আপিলের অধিকারও নেই।

এই তালিকায় রয়েছেন শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা ৮১ বছর বয়সী তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাকে ট্রাইব্যুনাল প্রথম আটক করে। এরপর প্রায় ২২ মাস কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই তিনি কারাগারে আছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জামিন চাইলেও ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেনি এবং কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির’ কারণও উল্লেখ করেনি। বরং দুই দফা শুনানি পিছিয়ে সর্বশেষ আগস্টের শেষ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্য ৭৫ বছর বয়সী কামাল আহমেদ মজুমদারও ২২ মাস ধরে আটক। তার পরিবারের ভাষ্য, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার পায়ে পচন ধরে তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। পড়ে গিয়ে তার কোমরের হাড়ও ভেঙেছে। জুলাইয়ে ট্রাইব্যুনাল তার জামিন আবেদন নাকচ করে।

৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবিরের দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তার চলাচলের জন্য হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়। অধিকারকর্মীরা তাকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ৭১ বছর বয়সী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীও কোনো অভিযোগ ছাড়াই ২২ মাস ধরে আটক আছেন এবং তার গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে।

কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ৮৫ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র সেনকে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনটি হত্যা মামলা ও একটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। তার পরিবার জানিয়েছে, তিনি যথাযথ ওষুধ পাননি এবং তার জামিন আবেদন নাকচ করা হয়েছিল। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ৬৫ বছর বয়সী এস এম জিয়াউল হক জিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। ৬ জানুয়ারি আটক করার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। জামিন নাকচ হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

এইচআরডব্লিউর হিসাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ পদধারী কারাগারে মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিল না। সংস্থাটি এসব মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও এইচআরডব্লিউ সরকারের সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল বর্তমান অবস্থায় পাস হলে নতুন কমিশন নির্বিচারে গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না। অথচ স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে এমন অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া জরুরি। জুলাইয়ের আরেক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিল, গুমের অভিযোগ তদন্তে পুলিশকে প্রধান দায়িত্বে রাখলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।

সাম্প্রতিক কয়েক মাসে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার ইস্যুতে এইচআরডব্লিউর প্রকাশ্য তৎপরতা যে বেড়েছে, তার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। মার্চে নতুন সরকারকে মানবাধিকার সংস্কারের আহ্বান, মে মাসে গুমের বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি, জুলাইয়ে গুমের নতুন ঘটনা, সাংবাদিক ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু, শাকিল আহমেদ ও শ্যামল দত্তের মামলা নিয়ে উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এবং সর্বশেষ আগস্টে রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল আটক রাখার অবসানের দাবি—সব মিলিয়ে এই সক্রিয়তা এখন বেশি দৃশ্যমান।

এই ধারাবাহিকতাকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো প্রমাণ না থাকলেও রাজনৈতিকভাবে এর তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আটক, বিচার এবং দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। আর এইচআরডব্লিউর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে একই সঙ্গে দুটি বিষয় সামনে এসেছে—শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হতে হবে এবং সেই বিচার করতে গিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বিচার আটক বা যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার লঙ্ঘন করা যাবে না।

এইচআরডব্লিউর ২৩ আগস্টের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্যও সেখানেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচার শুরুর আগে কাউকে আটক রাখার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেটি ব্যতিক্রম হওয়া উচিত, নিয়ম নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদাভাবে আটক রাখার প্রয়োজনীয়তা ও আইনগত বৈধতা বিচারকের পর্যালোচনা করা উচিত। বিচার শুরুর আগে আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচার পাওয়ার অথবা মুক্তি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে আটকসংক্রান্ত বিধিনিষেধ ব্যক্তিস্বাধীনতা, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্দোষ বিবেচিত হওয়ার নীতি এবং সমতার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

এলাইন পিয়ারসনের ভাষায়, যে বিচারব্যবস্থা অভিযোগ গঠনের আগেই প্রবীণ ব্যক্তিদের কারাগারে মারা যেতে দেয়, সেটি বিচার শুরুর আগে আটক রাখাকে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছে না। তার দাবি, বাংলাদেশ সরকারের উচিত তার নজরদারিতে কারাগারে ঘটে যাওয়া সব মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত করা এবং কোনো অভিযোগ ছাড়াই মানুষকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা বন্ধ করা।

কারো কারো মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর এইচআরডব্লিউ তৎপর হয়েছে কি না—এর সরল উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। বরং সংস্থাটির সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখায়, দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ধরন বদলেছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সংগঠনটির নজরদারির ক্ষেত্রও বদলেছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের জবাবদিহির দাবি যেমন তারা অব্যাহত রেখেছে, তেমনি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন আটক, জামিন না দেওয়া, কারাগারে মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াতেও আপত্তি তুলছে।

কেউ কেউ বলছেন, ২৩ আগস্টের প্রতিবেদনটি শুধু আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষে বক্তব্য নয়; একই সঙ্গে অতীতের অপরাধের বিচার এবং বর্তমানের বিচারপ্রক্রিয়া—দুটোকেই মানবাধিকার ও আইনের শাসনের একই মানদণ্ডে দেখার দাবি।