Image description

হতদরিদ্র মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল টুইন-পিট ল্যাট্রিন। একটি-দুটি নয়, ২ হাজার ৫০০টি। প্রতিটি ল্যাট্রিন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। তবে এসব ল্যাট্রিন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ডট লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপর প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, পুরোপুরি সংশোধন না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে একই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৫০০ ল্যাট্রিন নির্মাণের কাজও সেই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। আগের কাজের অনিয়মের অভিযোগের পরও একই প্রতিষ্ঠান নতুন কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, লক্ষ্মীপুর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌর এলাকায় ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২ হাজার ৫০০টি কনটেইনমেন্ট সিস্টেম নির্মাণের জন্য ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্যাকেজ নম্বর ছিল LAK-S2 এবং দরপত্রের পরিচিতি নম্বর ১০৪৫১৮৫। ই-জিপি প্রক্রিয়ায় কাজটি পায় গ্রিন ডট লিমিটেড।

স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি বিবরণ অনুসরণ করা হয়নি। ল্যাট্রিন নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও সুরকি ব্যবহার, মেহগনি কাঠের পরিবর্তে কড়ই কাঠ ব্যবহার এবং নির্ধারিত মাপের চেয়ে কম কাঠ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া চার ইঞ্চির পরিবর্তে তিন ইঞ্চি খুঁটি, তিনটি সিঁড়ির ধাপের পরিবর্তে দুটি বা একটি ধাপ এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম রিং দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

এসব অভিযোগের পর গত ২০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তার। চিঠিতে কাজের বিভিন্ন অনিয়ম উল্লেখ করে সেগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, চিঠির পরও সব কাজ সংশোধন না করেই প্রতিষ্ঠানটি বিল তুলে নেয়।

মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আনিসুর রহমান রনির দাবি, গ্রিন ডট লিমিটেডের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি বিবরণ অনুসরণ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু গ্রিন ডটের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে একই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৫০০ ল্যাট্রিন নির্মাণের জন্য গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্যাকেজ নম্বর LAK-S3 এবং দরপত্র নম্বর ১১৫০৭৮৫। গত ১৮ মার্চ দরপত্র খোলা হলে এতে অংশ নেয় ১০টি প্রতিষ্ঠান। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে যৌথভাবে কাজ পায় মেসার্স লাকি-এসজেসি (জেবি)। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ নেওয়ার জন্য ডাকা হলেও তারা উপস্থিত না হওয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রিন ডট লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এ নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, সর্বনিম্ন ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা কাজ না নেওয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রিন ডট কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।

তবে মেসার্স লাকি-এসজেসি (জেবি) প্রতিনিধি নাছির উদ্দিনের দাবি, তারা যে দর দিয়েছিলেন, তা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ওই দরে কাজ করলে তাদের আর্থিক ক্ষতি হতো। এ কারণে তারা কাজটি নেননি।

অভিযোগ অস্বীকার করে গ্রিন ডট লিমিটেডের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান আজাদ বলেন, আগের কাজে জায়গার সংকট থাকায় নকশায় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। পরে সেগুলো ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসাজশ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এ বি এম জাহিদুল ইসলামও। তিনি বলেন, আগের কাজ করা হয়েছে সঠিকভাবেই। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কাজ দেখে দিয়েছে ছাড়পত্র। এমনকি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকেও অনিয়মের বিষয়ে কোনো চিঠি পাননি বলে দাবি তার।

তবে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার হোসেন জানান, পৌরসভা এলাকায় ল্যাট্রিনগুলো স্থাপন করায় একটি ছাড়পত্র দিয়েছেন তারা। সেটি কাজের মানের ভিত্তিতে নয়, মূলত নির্মিত ল্যাট্রিনের সংখ্যা বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তার জানান, কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতাকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা আসেনি। এ কারণে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে ডাকা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই কাজ দেওয়া হবে।

গ্রিন ডটের আগের কাজের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ সংশোধনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার কথা বলা হয়েছিল।

অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম মেনেই ঠিকাদার নির্বাচন করা হচ্ছে। সর্বনিম্ন দরদাতা কাজ না নেওয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাহী প্রকৌশলী কাজের ছাড়পত্র দেওয়ার পরই ঠিকাদার বিল পান বলেও জানান তিনি।