ঢাকার সবুজবাগের মাদারটেক বাগানবাড়ি এলাকা থেকে এক তরুণীর খণ্ডিত মাথা ও দুই হাত উদ্ধারের ১৮ দিন পেরোলেও শরীরের বাকি অংশের খোঁজ মেলেনি।
এ ঘটনায় পাঁচজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। অন্য মামলায় কারাগারে থাকা আরেক আসামিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে, যার শুনানি রয়েছে সোমবার।
একটি গরুর খামার লাগোয়া সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার খণ্ডিত মাথার ছবি ও দুই হাতে থাকা ট্যাটু দেখে দেহাংশটি ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানীর বলে শনাক্ত করেছেন তার মা-বাবা। ১৯ বছর বয়সি ফালানী মুন্সীগঞ্জের ঢালীকান্দি গ্রামের বজলুল ব্যাপারীর মেয়ে।
ফালানীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ৬ অগাস্ট সবুজবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন এসআই রাশেদুল হাসান।
মৃতের শরীরের বাকি অংশ এখনো মেলেনি বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবুজবাগ থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকমকে বলেন, “পাঁচ আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কেউ মুখ খুলছে না।
“তবে আমরা ধারণা করছি, একাধিক ব্যক্তির সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত না হওয়ায় হয়ত এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।”
শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাহজাহানপুর কবরস্থান এলাকা থেকে ফালানীর বান্ধবী নুসরাত জাহান সাহিদাকে (১৯) এবং রাত পৌনে ১০ টার দিকে বাগানবাড়ি সেতু থেকে ফারুক ওরফে জামাই ফারুক (৪৫), সুজন (২০), মামুন (২০) ও রাফি ইসলাম ওরফে বাপ্পিকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শনিবার তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম প্রত্যেক আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ঘটনার আগের সিসিটিভির ভিডিওতে দেখা গেছে, ৩ অগাস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে ভুক্তভোগীসহ গ্রেপ্তার আসামিরা এবং আরও বেশ কয়েকজন অচেনা ব্যক্তি বাগানবাড়ি কালভার্টের ওপর অনেকক্ষণ একসঙ্গে বসেছিলেন।
পরে তারা ভুক্তভোগীকে অজানা স্থানে নিয়ে যান। তারপর থেকে ভুক্তভোগীকে আর কোথাও দেখা যায়নি। ৪ অগাস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ফারুক ও ফালানী বাদে অন্য অসামিরা কালভার্টের ওপর অবস্থান করেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর তারা যে যার মতো করে চলে যান।
এদিকে গেল ৫ অগাস্ট খিলগাঁও থানা পুলিশ রকি নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে, যিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মোমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামির উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে শুনানির জন্য আদালত সোমবার দিন রেখেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “ভিকটিম এবং আসামিরা একসাথে চলাফেরা করতো। চার বন্ধুর মধ্যে একজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে রাজি হয় ফালানী।
“সেখানে একজনের সাথে সে যায়। ওই সময় আরও তিনজন সেখানে ঢুকে পড়ে। তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে না জড়ানোয় হয়ত ধস্তাধস্তি হয়। এরপর খুনের ঘটনা ঘটে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সাহিদা বলেছে, এ ঘটনা রকি ঘটায়ছে। পরে আবার বলে, প্রথমে একজন, পরে আরেকজন, এরপর আরও একজন করছে। রকি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।
“আর যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা সাহিদার সাথে ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা মিটিং করছে। তিন জন এখনো পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
রকিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে বলা হয়েছে, রিমান্ডে থাকা সাহিদা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, কারাগারে থাকা রকি এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, রকি ঘটনাস্থলে ছিলেন।
যা বলেছেন ফালানীর বাবা-মা
দুই মেয়ে আর এক ছেলের মধ্যে ফালানী ছিল সবার ছোট। বড় মেয়ে আর ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন বজলুল বেপারী ও পেয়ারা বেগম দম্পতি। তারা দুইজন সবুজবাগের মায়াকানন ঢালে বসবাস করেন। বজলুল বেপারী মুগদার ঝিলপাড় মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। আর পেয়ারা বেগম রাস্তা পরিচ্ছন্নের কাজ করেন।
ফালানীর বাবা বজলুল বেপারী বলেন, “মেয়েটা কোথায় যেত বলে যেত না। আমাদের কথা শুনতো না। মাঝে একবার বলে, বিয়ে করছে। আমাদের কোনো কথার মূল্য দিত না।
“অনেক চেষ্টা করেছি ফিরিয়ে আনার, কিন্তু পারিনি। মেয়েটা খুন হল। কেমন যে লাগছে বলতে পারছি না। অনেক খারাপ লাগছে।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “১৫ অগাস্ট পুলিশ আমাদের ডেকে নিয়ে মেয়ের মাথা, দুই হাত দেখায়। তাকে দেখে চিনতে পারি।
“আমার মেয়েকে যারা খুন করেছে, তাদের বিচার চাই, দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই।”
মা পেয়ারা বেগম বলেন, “সে আমাদের কথাবার্তা শুনতো না। কই যায় না যায়, কিছু বলত না। অনেক চেষ্টা করেছি—ওকে ঘরে ফেরানোর। কিন্তু আমাদের কথা শুনত না। আমরা গরিব মানুষ।
“ওর বাবা মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, আর আমি রাস্তা-ঘাটে ঝাড় দেই। সকাল ৬টায় বাসা থেকে বের হই, বিকেল ৫টায় বাসায় ফিরি। মেয়েটাকে বাসায় রেখে পেটের ধান্দায় দৌড়াই।”
তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে মেয়েটার খবর নাই। কুত্তার মতো বিচড়ায়, কিন্তু পাইনি। ১৫ তারিখ পুলিশ আমাদের খবর দিয়ে নেয়।
“জামা দেখে চিনে ফেলি, সে আমাদের মেয়ে। শুনেছি, ওর কোনো বান্ধবী নিয়ে মারছে। আমরা মেয়ে হত্যার বিচার চাই।”
পেয়ারা বেগম বলেন, “মেয়েটার মাথা আর দুই হাত মর্গে পড়ে আছে। পুলিশ এখনো বডি খুঁজে পায়নি। কীভাবে আমার মেয়েটারে খুন করল, ওদের কলজেটা কাঁপেনি; ওরা মানুষ না?
“আমার মেয়েটা যদি অপরাধ করে থাকে, তাকে মারধর করে দিয়ে দিত; এভাবে কেন মারল? আমরা বিচার চাই, বিচার ছাড়া আর কিছু চাই না।”
সুজন, মামুন ও রাফির আইনজীবী উম্মে কুলসুম কুসুম বলেন, “তিন জনকে সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে। কারণ যে এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, আসামিদের বাড়ি তার থেকে কয়েক কদম দূরে। তারা ব্রিজের উপর আড্ডা দেয়।
“সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার। চাপ সৃষ্টি করেছিল স্বীকার করানোর জন্য। কিন্তু তারা তো জড়িত না। এজন্য রিমান্ড আবেদন করছে। তবে তারা ঘটনার সাথে জড়িত না।”