রংপুরে এক পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় ধোঁয়াশা কাটছেই না। এ ঘটনায় পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে অমিল পাওয়া যাচ্ছে। নিহত স্বজন ও স্থানীয়দেরও কাছে পুলিশের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না । ফলে চারজনের মৃত্যু ঘিরে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আরও বাড়ছে।
গত শনিবার নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়াস্থ নিজ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন রবিবার এঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় চারজনকে হত্যা করেন দুই যুবক। মরদেহের চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত ছিল এবং পাশেই কেমিকেলের আলামত পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।
তবে আজ সোমবার তাদের ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকের বক্তব্যে চোয়াল ভাঙা ও কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানানো হয়।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানালেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া চারজনেরেই শ্বাসরোধের আলামত পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মরদেহের মুখ এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকদিন মরদেহ পড়ে থাকার কারণে মুখমণ্ডল ঝলসে যাওয়ার মতো হতে পারে।
ময়নাতদন্তকারী এই চিকিৎসক আরও জানালেন, চারজনের ময়নাতদন্তের সময় বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে সিআইডির ল্যাবে।
এদিকে গ্রেপ্তার হওয়ার যুবকদের বিরুদ্ধে আগে স্থানীয় কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকার তথ্য মিলেনি। ফলে পুলিশের ব্যাখ্যা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
তাছাড়া মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল— এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। বাড়ির আলমারি ভাঙা, আসবাবপত্র তছনছ, স্বর্ণালংকারের বাক্স ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাকে সামনে এনে ডাকাতির সময় হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় সেই বক্তব্য। বলা হয়— ডাকাতির ঘটনা সাজানো হয়েছিল। এরপরই পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের।
যা বলছেন নিহতদের স্বজনরা
গণপতির স্ত্রীর নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, ‘ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে। এটা হয়! কিছুই বুঝতে পারছি না, পুলিশ যে কী করছে-কী হচ্ছে।’
গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বললেন, ‘আমার চাচা শ্বশুর আমাকে বলেছিলেন তাকে নাকি কারা হুমকি দেন। আমি তার কাছে বারবার সেসব ব্যক্তির নাম শুনতে চাইলেও তিনি বলেননি। পরে জানান, তাদের সঙ্গে মীমাংসা করে ফেলেছেন। এখন এই বিষয়টিও খুব ভাবাচ্ছে।’
গণপতি চক্রবর্তীর ভাই মামলার বাদি গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘কিছু মাথায় ঢুকছে না। মনে হয় এটি শুধু মাদকের কারণে নয়, পরিকল্পিত খুন। আবার তার কোনো শত্রু থাকতে পারে এমনটিও নয়।’
গোপীনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী বলেন, ‘এতো ভালো মানুষের কোনো শত্রু থাকার কথা নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।’
গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস বললেন, ছেলেকে তো পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার দোষ থাকলে শাস্তি হোক আমিও চাই। কিন্তু দুজন মিলে চারজনকে কীভাবে খুন করতে পারে! তাছাড়া ঘটনার পরও পালিয়ে যায়নি তারা।
খুনের ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করেন রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ। তার মতে, চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হোক। কোনোভাবেই যেনো প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা না হয়।
এর আগে শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে প্রিয়মও (১২) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে রবিবার ভোরে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে তারা গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেলায় তাকেসহ পরিবারের চার সদস্যকে এক এক করে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তারা।
মরদেহ উদ্ধারের তিন দিনপরও সোমবার মাছুয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ, রয়েছে চাপা উত্তেজনা।
‘ছেলে দোষী হলে শাস্তি হোক’
গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস বললেন, ছেলেকে তো পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার দোষ থাকলে শাস্তি হোক আমিও চাই। কিন্তু দুজন মিলে চারজনকে কীভাবে খুন করতে পারে! তাছাড়া ঘটনার পরও পালিয়ে যায়নি তারা।
সিদ্ধার্থের বাবার সুরেই কথা বললেন মুগ্ধর মা সেনা রানী। তার ভাষ্য, ছেলে দোষী হলে শাস্তি দিক। কিন্তু এর সঙ্গে আর কারা জড়িত তাদের বের করা হোক।
নিহতদের স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধারসহ ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে রবিবার সন্ধ্যায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রবিবার রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালি থানায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন।
কোতয়ালি থানার ওসি নাজমুল কাদের জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এই যুবক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কী বলছে পুলিশ
এ ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানালেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। বললেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে একটি ছুরি পেয়েছি, যেটাতে আগুনে পোড়ানোর দাগ রয়েছে। এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শেষ হলে আসামিদের শরীর খুব উত্তেজিত ছিল। তখন তারা শসা খায়। এরপর তারা গোসল করে। তদন্ত চলছে, প্রয়োজনে আগামী দুই-তিনদিনের মধ্যে আবারও এই মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানানো হবে—যোগ করেন পুলিশ কমিশনার।
দায় স্বীকার দুই আসামির
চার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক রফিকুল ইসলাম তাদের জবানবন্দি নেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মিলন চ্যাটার্জি জানান, আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার দুই যুবক। জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন আসামিরা। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
জবানবন্দি শেষে রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
পাশাপাশি জ্বলল চারটি চিতা
রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে রবিবার রাতে সম্পন্ন হয়েছে একই পরিবারের চারজনের শেষকৃত্য। পাশাপাশি চারটি চিতায় দাহ করা হয় তাদের। এদিন রাত ৮টার দিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চারটি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ৯টার দিকে মরদেহগুলো দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। এরপর পরপর চারটি চিতায় তাদের মরদেহ তোলা হয়। মুখাগ্নি করেন স্বজনরাই। রাত ১১টার দিকে শেষ হয় দাহকার্য।
বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রংপুর জেলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিল করেছে। এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পুলিশ প্রশাসনকে তিনদিনের আলটিমেটাম দেন তারা। সোমবার দুপুরে নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা।
সাবেক শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বললেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদঘাটন করতে হবে। ঘটনার সত্যটা জানতে চাই। খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটলো? চারজনকে হত্যা করা হলো আশপাশের কেউ টের পেল না। এরকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই দুজনকে ধরে বলে দিল এরা খুনের সঙ্গে জড়িত। এসব বুঝি না— বলছিলেন সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার।
এদিন বিকেলে নগরীর প্রেসক্লাব চত্বরে হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়।
এসময় বক্তব্য দেন, মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য বিজয় প্রসাদ তপু, রংপুর মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবীর হোসেন আশরাফী, কবি মওদুদ আহমেদ প্রমুখ।