Image description

পাঠদান চলছে, বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও থেমে নেই। তবে রাজশাহীর অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। জেলার ১ হাজার ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৮৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদশূন্য। ফলে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের বড় অংশ সামলাতে হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের। এতে বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম।

রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ হাজার ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১ হাজার ৫৭টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৬৮ জন। অর্থাৎ ৫৮৯টি পদই শূন্য। ফলে জেলার মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫৬ শতাংশের বেশি বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এসব বিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

উপজেলাভিত্তিক হিসাবে প্রধান শিক্ষক পদে সবচেয়ে বেশি সংকট বাগমারায়। এ উপজেলায় ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৭৫ জন। শূন্য রয়েছে ১৪৫টি পদ। গোদাগাড়ীতে ১৬৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৬ জন, শূন্য ৮৯টি। তানোরে ১২৮টি পদের মধ্যে কর্মরত ৪৩ জন, শূন্য ৮৫টি।

দুর্গাপুরে ৮৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ৩৭ জন, শূন্য ৪৬টি। পুঠিয়ায় ৯০টি পদের মধ্যে কর্মরত ৪১ জন, শূন্য ৪৯টি। পবায় ৮৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪০ জন, শূন্য ৪৩টি। বাঘায় ৭৪টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩৫ জন, শূন্য ৩৯টি। চারঘাটে ৭৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৩২ জন, শূন্য ৪১টি। মোহনপুরে ৮১টি পদের মধ্যে কর্মরত ৪১ জন, শূন্য ৪০টি। আর বোয়ালিয়া থানা এলাকায় ৬০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৮ জন; শূন্য রয়েছে ১২টি পদ।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা।

এই হিসাবে গোদাগাড়ীতে পদোন্নতিযোগ্য পদ ১৩২টি, চারঘাটে ৫৮টি, তানোরে ১০২টি, দুর্গাপুরে ৬৬টি, পুঠিয়ায় ৭২টি, পবায় ৬৬টি, বাগমারায় ১৭৬টি, বাঘায় ৫৯টি, বোয়ালিয়ায় ৪৮টি এবং মোহনপুরে ৬৫টি। সব মিলিয়ে জেলায় পদোন্নতিযোগ্য পদের সংখ্যা ৮৪৪টি। এর বিপরীতে পদোন্নতির মাধ্যমে কর্মরত আছেন মাত্র ৭১ জন।

অন্যদিকে, ২০ শতাংশ হিসাবে সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদ রয়েছে ২১৩টি। এ কোটায় সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে কর্মরত আছেন ৩৬৯ জন। ফলে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের হিসাবেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে ১৫৭ জন শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে বাগমারায় ৩৪ জন, তানোরে ২০ জন, দুর্গাপুরে ২০ জন, মোহনপুরে ১৮ জন, পুঠিয়ায় ১৭ জন, পবায় ১৫ জন, বাঘায় ১২ জন, গোদাগাড়ীতে ১১ জন এবং চারঘাটে ১০ জন রয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের বড় অংশই সামলাতে হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের। সরকারি বিভিন্ন তথ্য অনলাইনে পাঠানো, সভায় অংশ নেওয়া, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, মিড-ডে মিলসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। এতে অনেক ক্ষেত্রে পাঠদানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

পবা উপজেলার বাগসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল ওদুদ বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি ঠিকই। কিন্তু একজন সহকারী শিক্ষকের পক্ষে প্রশাসনিক সব দায়িত্ব সামলানো অত্যন্ত কঠিন। পূর্ণ ক্ষমতা না থাকায় অনেক জরুরি সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না।’

বাগমারা উপজেলার হাটগাঙ্গোপাড়া এলাকার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাজমুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব এক নয়। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রশাসনিক অনেক জটিলতা তৈরি হয়। সরকার চাইলে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদায়ন করতে পারে। কিন্তু কী কারণে তাদের ভারমুক্ত করা হচ্ছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার কারণে এত দিন পদোন্নতি বন্ধ ছিল। এখন সহকারী শিক্ষকদের কাছে এসিআর (গত পাঁচ বছরের মূল্যায়ন) চাওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হবে।’

রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শূন্য পদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’