Image description

ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে যে আগুন ৯টি প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, গতকাল বৃহস্পতিবারও তার রেশ কাটেনি। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক, অন্য দুজন ভারতীয়। শোকের পাশাপাশি এখন সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন— বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে কি না এবং এ দুর্ঘটনার দায় কার? একটি সূত্র বলছে, আজ শুক্রবার সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরতে পারে। তবে স্পষ্ট করে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি কোনো পক্ষই।

সাত মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রস্তুতিগতকাল পরিচয় শনাক্ত হওয়া এস এম আলিমুজ্জামান (৪৫) এবং রেবতী সরকার দুজনই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ  উপজেলার বাসিন্দা। বাংলাদেশ হাইকমিশনের নথি, হোটেলের কাগজপত্র ও পাসপোর্টের তথ্য মিলিয়ে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আলিমুজ্জামান ছিলেন ব্যবসায়ী, চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন কলকাতায়।

রেবতীও চিকিৎসার প্রয়োজনেই ছিলেন কলকাতায়। এই দুজনসহ আগে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সাত বাংলাদেশির বেশিরভাগই ভারতে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য।

দুর্ঘটনায় অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে। গতকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ময়নাতদন্তের পর প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ শেষ করে মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তবে ঠিক কোন দিন বা কোন সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পৌঁছবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি সময়সূচি এখনো জানানো হয়নি। যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলকাতা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানালেন, গতকাল রাত ৮টায় সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শুক্রবার পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

যা বললেন দীনেশ ত্রিবেদী: ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এ দুর্ঘটনার বিষয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল তিনি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিতের চেষ্টা করা হবে। অর্থাৎ মরদেহ ফেরানোসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতার বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশন পাশে থাকবে বলেই বার্তা দিলেন।

ক্ষতিপূরণ দেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার?: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আলাদা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো ঘোষণা গতকাল পর্যন্ত সামনে আসেনি। ফলে বাংলাদেশি নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য রাজ্য সরকারের কোনো নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ থাকবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার নিউ মার্কেট থানার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলার ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিটের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেসময় হোটেলে ছিলেন ১০ জন আবাসিক। তাদের মধ্যে মাত্র দুজন প্রাণে বাঁচেন। জানালা দিয়ে বেরিয়ে কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই দুজনকে পরে উদ্ধার করেন দমকল বাহিনীর সদস্যরা।

ঘটনার তদন্তে আবু জাফর নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যার নামে ওই হোটেলটি লিজ নেওয়া। গত বুধবার রাতেই এন্টালি মেন মার্কেট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া হোটেলের ম্যানেজার ও কর্মীদেরও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল হোটেলের লিজ, অগ্নিনিরাপত্তা, কর্মীদের ভূমিকা এবং আগুনের সূত্রপাত— সব দিক খতিয়ে দেখছে।

১৩ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ: অগ্নিকাণ্ডের পর মির্জা গালিব স্ট্রিটের ৯টি গেস্টহাউস এবং ৪টি রেস্তোরাঁ-কাম-পানশালাকে শোকজ করেছে দমকল বিভাগ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জবাবও দিতে বলা হয়েছে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে পুরোপুরি সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

শিখা ইন হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ, যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম ছিল না। পেছনের জরুরি বহির্গমন পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরু ঘুপচি পরিসর, কাঠের ফলস সিলিং এবং ঘন ধোঁয়া আগুনকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলেছিল বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা।