কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা এইচ এম সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাজেদা বেগম তথ্য গোপন করে নিবন্ধন সনদ নিয়েছিলেন ২০১২ সালে। অবৈধভাবে অর্জিত এই সনদ দিয়েই নিয়েছিলেন চাকরি; হয়েছিলেন এমপিওভুক্ত। বিষয়টি জানাজানি হলে ওই সনদ বাতিল করে ২০২৫ সালে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। এই সনদ কোথাও ব্যবহার করলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে সংস্থাটি। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো এমপিও বাতিল হয়নি সাজেদা বেগমের। সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তিনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, যে সনদ দিয়ে প্রার্থী চাকরির সুপারিশ পেয়েছেন, সেই সনদ বাতিল হলে ইনডেক্স বাতিলসহ বেতন-ভাতা বন্ধ হবে; বাতিল হবে নিয়োগও। এমনকি ইতোমধ্যে নেওয়া বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ফেরত দিতে হতে পারে। কোনোভাবেই এমপিও বহালের সুযোগ নেই সাজেদা বেগমের।
যদিও সাজেদা বেগম দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। আদালত তার এমপিও বহাল রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে বাতিল হওয়া সনদ দেখিয়ে এমপিও বহালের নির্দেশনা কীভাবে দিয়েছে; সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর মো. সাখাওয়াত হোসেন খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এমন ঘটনা ঘটে থাকলে সেটি অন্যায়। তবে এ ধরনের ঘটনা আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলায় অনার্স কিংবা ৩০০ নম্বরের বাংলা না পড়েও জালিয়াতি করে এনটিআরসিএ সনদ নেন সাজেদা বেগম। যোগ্যতা পূরণ না করেও বাংলায় নিবন্ধন পাস, তারপর সমাজবিজ্ঞানের সহকারি শিক্ষক পদে নিয়োগ এবং পরবর্তী এমপিও চালু করিয়ে নেন অনায়াসে। ভুয়া সার্টিফিকেট গহণের পর এই শিক্ষককে নিয়োগ দিতে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে জোয়ারিয়ানালা এইচ এম সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হকের বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালে মার্চের শুরুতে প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক স্বাক্ষরিত আবেদনে মাউশি মহাপরিচালক বরাবর অনুরোধ করা হয় সাজেদা বেগমের নাম এমপিওভুক্ত করার। শুধু তাই নয়; শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, নিবন্ধনের সত্যতার মতো বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করার দায়িত্ব ম্যানেজিং কমিটির। এই শিক্ষকের নিবন্ধনের কাগজ ঘেঁটে দেখা গেছে, নিয়োগের বিষয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন প্রধান শিক্ষক।
সাজেদা বেগমের এনটিআরসিএর সার্টিফিকেট যাচাই করে দেখা যায়, তিনি ৮ম ব্যাচ থেকে ২০১২ সালে বাংলায় নিবন্ধন পেয়েছিলেন। যদিও তার নিয়োগ হয় সমাজ বিজ্ঞানের সহকারি শিক্ষক হিসেবে। এছাড়াও তার ডিগ্রির রেজাল্ট ঘেটে দেখা গেছে, এই শিক্ষিকা ১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের রামু কলেজ থেকে মানবিকে তৃতীয় বিভাগ পেয়ে পাস করেন। কিন্তু বাংলায় নিবন্ধন পেতে হলে ৩০০ নাম্বারের বাংলা বাংলা থাকা বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছে এনটিআরসি কর্তৃপক্ষ। যেটি অভিযুক্ত এই শিক্ষকের নেই।
সাজেদা বেগমের সনদ বাতিল সংক্রান্ত চিঠিটি জারি করা হয় ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। চিঠিতেও একই ধরনের বিষয় উল্লেখ করেছে এনটিআরসিএ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সাজেদা বেগমের ডিগ্রী পাস ও সার্টিফিকেট কোর্স পরীক্ষা ১৯৯৯ এর নম্বর পত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জনাব সাজেদা বেগম স্নাতক পর্যায়ে ৩০০ নম্বরের বাংলা বিষয় পাঠ করেননি। অর্থাৎ এনটিআরসিএ ব্যবস্থাপনায় ২০১২ সালে গৃহীত ৮ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক সহকারী শিক্ষক (বাংলা) পদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা (ন্যূনতম) জনাব সাজেদা বেগমের ছিল না।
সাজেদা বেগম ২০১২ সালে গৃহীত ৮ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে Assistant Teacher, Bengali পদের জন্য আবেদন করে ৮ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা-২০১২ এ অংশগ্রহণ করেন এবং উক্ত নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রত্যয়নপত্র লাভ করেন। তথ্য গোপন করে সাজেদা বেগমের শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্র অর্জনের অভিযোগ “বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা, ২০০৬ (সংশোধিত)” এর ১২(২) বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হয় এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা, ২০০৬ (সংশোধিত)-এর ১২ (২) বিধি অনুযায়ী৮ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা-২০১২ এর 30103054 রোল নম্বরধারী Sajeda Begum, পিতা: Shafekul Islam, মাতা: Khudeza Begum এর Assistant Teacher, Bengali পদের শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্রটি যার রেজি. নম্বর 2012810066 এবং সিরিয়াল নম্বর 10148612 নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো। বাতিলকৃত নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্রটি কোথাও ব্যবহার করা হলে তা ফৌজদারী অপরাধ বলে গণ্য হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাজেদা বেগম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আদালতে মামলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশনায় আমি বেতন পাচ্ছি।’ তবে মামলার রায়ের কপি চাইলে তিনি দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জোয়ারিয়ানালা এইচ এম সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হককে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাহাজান লুতু বলেন, ‘সাজেদা বেগমের বিষয়ে বিগত কমিটি একটি মামলা করেছিল। মামলায় তিনি স্টে অর্ডার পাওয়ায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তবে নিবন্ধন সনদ এনটিআরসিএ বাতিল করেছে তা জানা ছিল না। সনদ বাতিল হলে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এমন ঘটনা আমার জানা নেই। তথ্য প্রমাণ থাকলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’