Image description
উচ্চ ব্যয়ে আমানত সংগ্রহ

নতুন ঋণ বিতরণে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংককে সতর্ক করেছে সরকার। আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ধকল কাটিয়ে ব্যাংকটিকে শক্তিশালী ও লাভজনক অবস্থানে ফেরানোর পাশাপাশি টেকসই রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে ব্যাংকটির বিশেষ বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি ও নিয়মনীতি-বহির্ভূতভাবে অর্থ বিতরণের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেসিক ব্যাংক। বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ঘাটতি ও আমানতকারীদের আস্থার সংকটে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। প্রায় বন্ধ হয়ে যায় বড় ঋণ কার্যক্রমও।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেসিক ব্যাংকের আমানত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিনের সমস্যার প্রেক্ষাপটে আমানত বৃদ্ধি গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। তবে আমানত বৃদ্ধি চূড়ান্ত সাফল্য নয়। আমানত কত ব্যয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সেই অর্থ কতটা নিরাপদ ও লাভজনকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ ব্যয়ে আমানত সংগ্রহ করে কার্যকর ও লাভজনক বিনিয়োগে ব্যবহার করতে না পারলে মুনাফায় ফেরার সক্ষমতা আরও চাপে পড়বে বলে ব্যাংকটিকে সতর্ক করা হয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদকে বলা হয়েছে, নতুন ঋণে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়। বড় ঋণ অনুমোদনের আগে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, গ্রুপ এক্সপোজার, প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা এবং জামানতের বাস্তব মূল্য কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। অতিরিক্ত কনসেনট্রেশন রিস্ক এড়িয়ে ঋণ পোর্টফোলিও বহুমুখী করতে হবে। সিএমএসএমই (কটেজ, মাইক্রো, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) ঋণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও যথাযথ মূল্যায়ন, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ ও নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

ব্যাংকটির পরিচালক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ ফরিদ বলেন, ‘ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ দিতেও শুরু করেছে। হয়তো সরকার যতটা প্রবৃদ্ধি চাইছে ততটা হচ্ছে না, তবে এগোচ্ছে।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে বৈঠকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় খেলাপি হিসাবভিত্তিক সমস্যা সমাধান, শ্রেণীকৃত ও অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায় বাড়ানো, নতুন খেলাপি কঠোরভাবে প্রতিরোধ, আমানতকে লাভজনক সম্পদে রূপান্তর, পরিচালন লোকসান ও মূলধন ঘাটতি কমানো, ব্যয় দক্ষতা বাড়ানো, দক্ষ জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, গ্রাহক আস্থা ও সুনাম পুনর্গঠন।

ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। তাই নগদ অর্থ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিশেষ এক্সিট সুবিধা’ ব্যবহার করে নগদ আদায় ত্বরান্বিত করার নির্দেশ থাকলেও এটি যেন খেলাপি আড়াল বা দায় এড়ানোর হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংককে তার ঐতিহাসিক সিএমএসএমই পরিচয়ে ফেরানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উৎপাদনশীল খাত, নারী উদ্যোক্তা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এমন খাতে অর্থায়ন বাড়াতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বড় ঋণ, কানেক্টেড লেন্ডিং, কনসেনট্রেশন রিস্ক ও অভ্যন্তরীণ অডিটে পরিচালনা পর্ষদকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

নিজস্ব সক্ষমতায় মূলধন ঘাটতি পূরণে গ্রহণযোগ্য ক্যাপিটাল রিস্টোরেশন পরিকল্পনা, প্রভিশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন, অ-কোর সম্পদ বিক্রি ও নিজস্ব আয় বাড়িয়ে মূলধন শক্তিশালী করার রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে পোস্টিং ও পদোন্নতি, যোগ্য কর্মকর্তাদের ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ এবং শক্তিশালী সিএমএসএমই ও ঋণ পুনরুদ্ধারে দল গঠন করতে বলা হয়েছে।