নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। সিইসির ঘোষণা অনুযায়ী, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট এবং বিরোধীদলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাজনীতিতে একটি সংগ্রামী জীবন। রয়েছে অনেকগুলো বাঁক। বহু পরিচয়। কখনো তিনি শিক্ষক। কখনো প্রশাসনের কর্মকর্তা। কখনো মন্ত্রী। কখনো রাজপথের মিছিলের অগ্রভাগের নেতা। কখনো কারাগারের অন্ধকার কুঠুরি। কখনো আদালতের কাঠগড়া। কখনো উত্তাল রাজপথে সামনের সারিতে নেতৃত্ব। আবার কখনো সংসদে জনগণের দায়িত্বভারে। মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন। নির্যাতন এসেছে। এসেছে রাজনৈতিক ঝড়ও। তবু থামেননি। সময়ের স্রোত বদলেছে। রাজনীতির রং বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে গেছেন তার নিজের মতো করেই; সাহস, দৃঢ়তা, রাজনীতিতে অনুকরণ ও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে। রংপুরের যে অঞ্চলে এখনো উন্নয়নের হাওয়া বয়ে যায়নি, সেই অঞ্চল থেকেই এবার মর্যাদার চেরাগ হাতে নিলেন বিএনপির সাবেক এই মহাসচিব।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে আজ। ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার পর ভোট গণনা শেষে এ ঘোষণা দেন নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
তিনি জানান, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। সিইসির ঘোষণা অনুযায়ী, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট এবং বিরোধীদলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
সিইসির ঘোষণার পর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দীর্ঘ হাসিনা যুগে একজন মির্জা ফখরুলের ভদ্রতা ও নম্রতার আওয়ামী লীগের নেতারাও প্রশংসা করেছিলেন। ডান-বাম সব দলের কাছেই তিনি ছিলেন সম্মান ও মর্যাদায় প্রশংসনীয়। বাম রাজনীতির মশাল নিয়ে, ডানের চেরাগে সংগ্রাম করে আজ তিনি রাষ্ট্রপতির আসনে। এ যেন এক দীর্ঘ অভিযাত্রা। এক জীবনের গল্প। এক রাজনীতিকের গল্প। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিরও এক দীর্ঘ সময়ের গল্প।
৭৭ বছরের জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হেঁটেছেন বহু পথ। ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শ্রেণিকক্ষ থেকে সচিবালয়। সরকারি চাকরি থেকে সক্রিয় রাজনীতি। পৌরসভা থেকে সংসদ। মন্ত্রিসভা থেকে রাজপথ। আর সবশেষে—বঙ্গভবনের দুয়ারে। দেশের রাজনীতির ভেতরে-বাইরে এখন আলোচনার কেন্দ্রে তাই একটিই নাম—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
একসময় যে মানুষটি অর্থনীতির শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের বোঝাতেন অর্থনীতির কঠিন সূত্র, সেই মানুষটিই আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। একসময় যার কণ্ঠ মিশেছে মিছিলের স্লোগানে, সেই কণ্ঠই এবার শোনা যাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বের পরিসরে।
এই পথ সহজ ছিল না। বরং বারবার এসেছে অন্ধকার। বারবার এসেছে বাধা। বারবার এসেছে কারাগারের দরজা। তার বিরুদ্ধে হয়েছে ১১১টি মামলা। জীবনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার তাকে যেতে হয়েছে কারাগারে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিন দফা গ্রেপ্তার হয়েছেন। জীবনের প্রায় সাড়ে তিন বছর কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর। তবু ফিরে এসেছেন। বারবার। রাজপথে। রাজনীতিতে। মানুষের কাছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। পারিবারিক পরিবেশেই জনজীবন ও রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয়ের শুরু। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে অর্জন করেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।
ছাত্রজীবনেই তার রাজনীতির প্রথম পাঠ। বাম রাজনীতি দিয়েই যাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। ছিলেন এস এম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকও। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম অধ্যায় ছিল বামপন্থী রাজনীতিকে ঘিরে। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে। বদলেছে রাজনৈতিক পরিসরও। বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির পথ পেরিয়ে একসময় তিনি এসে দাঁড়ান বিএনপির রাজনীতিতে। সেই পথ ছিল দীর্ঘ। ছিল নানা বাঁক। ছিল মত ও পথের পরিবর্তন। কিন্তু প্রতিটি বাঁকই যেন তাকে নিয়ে গেছে বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতির দিকে।
রাজনীতির পাশাপাশি কর্মজীবনেও ছিল বৈচিত্র্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন। শ্রেণিকক্ষের শান্ত পরিবেশ থেকে একসময় প্রবেশ করেন প্রশাসনের ব্যস্ত করিডরে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রশাসনের চাকরি তাকে আটকে রাখতে পারেনি। সাধারণ মানুষের রাজনীতির টান ছিল প্রবল। তাই ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জনসম্পৃক্ত রাজনীতির এই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে। পরে কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর শুরু হয় দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার উত্থান। ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে দায়িত্ব পান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের। আর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে টানা দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ এই সময়ে বিএনপির জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটির মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির ওপর নেমে এসেছিল দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক সংকট। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের প্রবাসে অবস্থানের সময় দেশে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার বড় দায়িত্ব এসে পড়ে মির্জা ফখরুলের কাঁধে। রাজপথের আন্দোলন থেকে দলীয় কর্মসূচি—সবখানেই তাকে সামনে থাকতে হয়েছে। মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাগারে গেছেন। তবু দলের নেতৃত্ব ছাড়েননি।
২০১৮ সালে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েও ভোট কারচুপির প্রতিবাদে দলের সিদ্ধান্তে শপথ না নিয়ে তিনি রাজনৈতিক অবস্থানের একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসেন তিনি। শিক্ষকতা থেকে মন্ত্রিত্ব—জীবনের আরেকটি বৃত্ত যেন পূর্ণ হয় সেখানে। ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল পরিচিত বিনয়ী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ হিসেবে।
তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁদের বড় মেয়ে ড. মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
একটি জীবনের এতগুলো অধ্যায়। এতগুলো পথ। এতগুলো লড়াই। আর এখন সামনে একটি নতুন দরজা। বঙ্গভবনের দরজা।
রাজনীতির উত্তপ্ত রাজপথ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার এই যাত্রা নিছক ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার গল্প নয়। এর ভেতরে আছে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এক মানুষের রাজনৈতিক অভিযাত্রা। আছে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রবেশের গল্প। আছে শিক্ষকতার মমতা, প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব এবং বিরোধী রাজনীতির কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি।
বার্ধক্য এসেছে। শরীর ক্লান্ত হয়েছে। রাজনীতির আকাশে ঝড় এসেছে বারবার। তবু তিনি দাঁড়িয়ে থেকেছেন। আজ সেই দীর্ঘ পথের শেষে তার সামনে রাষ্ট্রপতির পদ। রাজপথ থেকে বঙ্গভবন। মিছিল থেকে রাষ্ট্র। শিক্ষকের চেয়ার থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই যাত্রা তাই শুধু একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক দীর্ঘ অধ্যায়—যার পরবর্তী পৃষ্ঠা লেখা হবে বঙ্গভবনে।