বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে সরকারের নানা উদ্যোগ ও অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ছয় মাসের নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় শতভাগ পূরণের দাবি করা হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, দ্রব্যমূল্য, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন জাতীয় অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্। দৈনিক যুগান্তরের ছাপা সংস্করণে আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তার সাপ্তাহিক উপসম্পাদকীয় ‘শতফুল ফুটতে দাও’-এর লেখায় তিনি সরকারের ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন। লেখাটির শিরোনাম ‘জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছেন তিনি’।
ড. মাহবুব উল্লাহ্ মনে করেন, বর্তমান সরকার যে অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েছে, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ছয় মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা বিচার করা ঠিক হবে না। তার মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
তিনি লিখেছেন, “কী অবস্থায় বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে?” তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয়। সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্র, কারাগার, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এর বাইরে ছিল না।
ড. মাহবুব উল্লাহ্ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বোঝাতে ডারন এসেমগলু ও জেমস এ. রবিনসনের ‘হোয়াই নেশনস ফেইল’ বইয়ের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি বলেন, যেসব দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, সেসব দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সামরিক বাহিনীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ভারতে চলে যান। তাদের মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানও ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠার কথাও তিনি লিখেছেন। একই সঙ্গে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কিছু সামরিক কর্মকর্তার ক্যু করার পরিকল্পনার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে সামরিক বাহিনী সম্পর্কে তিনি একপেশে মূল্যায়ন করেননি। তার মতে, বাহিনীর দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রমনা সদস্যরা শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। বরং তারা ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন।
পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ড. মাহবুব উল্লাহ্ আরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে পুলিশ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, “বস্তুত পুলিশবাহিনী ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ঠেঙাড়ে বাহিনী।”
গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর বড় অংশ কর্মস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল বলে তার মূল্যায়ন।
শিক্ষা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিপর্যয়ের কথা লিখেছেন ড. মাহবুব উল্লাহ্। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও ডিনদের অনেকে পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের দলীয়করণের কারণে আমলাতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
এই অবস্থায় নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়াকে তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেন, “নির্বাচিত নতুন সরকার এমনই এক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।” তার মতে, সরকার বিপ্লবের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও পুনঃরূপায়ণের কথা বলেছে। তাই ছয় মাসে কতটা কাজ হয়েছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে সরকারের মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
ড. মাহবুব উল্লাহ্ সরকারের প্রথম বৈঠকে কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফের ফলে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে বলেও তিনি মনে করেন।
তার ভাষায়, “এটি একটি জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্ত। অর্থনীতিশাস্ত্রের বিচারে এক্ষেত্রে ডিউ ডিলিজেন্সের অভাব রয়েছে।” তবে তিনি মনে করেন, কৃষকেরা উৎপাদনে ভূমিকা রাখেন। তাদের ঋণ মওকুফকে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপিদের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
সরকারপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছেন ড. মাহবুব উল্লাহ্। সময়মতো অফিসে উপস্থিত হওয়া, সরকারি গাড়িবহর ছোট রাখা এবং সভা-সমাবেশে আপ্যায়নে ব্যয় কমানোর উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগকেও তিনি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন। তার ধারণা, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এসব কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে তিনি সফল বলে উল্লেখ করেছেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং চীনের সঙ্গে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষ করে ঢাকা-কুনমিং করিডর বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ড. মাহবুব উল্লাহ্। তার মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার অবস্থান থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাবে। তিনি মনে করেন, চীনের সহযোগিতা থাকলে এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সফরের জন্য দিল্লি এখনো সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেনি। তার অভিযোগ, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো বক্তব্য দিচ্ছেন।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়েও তিনি ভারতের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ভারত সরকার তাকে নিবৃত্ত করছে না এবং দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণও করছে না।
তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন ড. মাহবুব উল্লাহ্। তিনি লিখেছেন, “ভারত সফর প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছেন, এমনটাই বিশ্বাস করতে চাই।”
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে তাই ড. মাহবুব উল্লাহ্ শুধু অর্জন বা ব্যর্থতার হিসাবকে সামনে আনেননি। তিনি রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতার কথাও বলেছেন। তার দৃষ্টিতে, এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারের আন্তরিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনগুলোতে সেই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী ও কার্যকর হয়, সেটিই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।