Image description

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নেই বললেই চলে। সকালে এবং বিকেলে অফিসগামী মানুষের যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। কর্মজীবী নারীদের জন্য তা আরও দুরূহ। নগরীর কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে আবারও পৃথক ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরে ১৪টি বিশেষ বাস চালুর মাধ্যমে নতুন করে এ সেবা শুরু হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে এই বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই জানানো হবে, কোন বাস কখন কোন রোডে কখন চলাচল করবে।

বিআরটিসি জানিয়েছে, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গোলাপি রঙের এসব বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নারীরা। নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, আগের উদ্যোগগুলোর মতো এবারও কি ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস মুখ থুবড়ে পড়বে? কারণ, বিআরটিসি অতীতেও একাধিকবার নারীদের জন্য পৃথক বাস চালু করেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়া, রুট নির্ধারণে দুর্বলতা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাবে সেসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাই এবারও বিআরটিসির এই উদ্যোগের সুফল মিলবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অংশীজনেরা।

 

বিআরটিসি সূত্র জানায়, বিআরটিসির ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস রাজধানীতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চালু হয় ১৯৯৮ সালে। ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় তা সম্প্রসারণ করা হয়। পরে ২০০৯ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সেবাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে রাজধানীতে ফের নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালু করে বিআরটিসি। কিন্তু যাত্রীসংকটে এ উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজধানীতে নারীদের জন্য ১২টি বিশেষ বাস নামানো হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু বাস ছিল ৫২ আসনের, আবার কিছু ৭৪ আসনের। সকালে ও বিকেলে অফিস সময়কে কেন্দ্র করে এসব বাস পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু নারী যাত্রীরা এ বাসের জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতেন না। সামনে যে বাস পেয়েছেন সেসব বাসে উঠে তারা যাতায়াত করতেন। ফলে কার্যত সেবাটির সুফল মেলেনি।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক বিআরটিসির এক বাসচালক জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারী যাত্রীদের পক্ষ থেকেই পৃথক বাসের তেমন চাহিদা নেই। ফলে যাত্রী সংগ্রহ করতেই হিমশিম খেতে হবে এবং সেবা পরিচালনায় লোকসান গুনতে হবে সংস্থাটিকে। আর লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন এই সেবা চালু রাখতে পারবে না বিআরটিসি।’

 

তিনি বলেন, ‘শহরে একা চলাফেরা করা নারী যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। অনেক নারী বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা বন্ধুর সঙ্গে চলাচল করেন। কিন্তু পৃথক মহিলা বাসে শুধু নারী যাত্রী ওঠার সুযোগ থাকলেও অনেকেই এই সেবা গ্রহণ করবেন না।’

মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালী-বাড্ডা হয়ে কুড়িল পর্যন্ত বিআরটিসির বেশকিছু দোতলা বাস চলাচল করে। সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে মহাখালী রেলক্রসিং এলাকায় একটি দোতলা বাসে দেখা যায়, বাসটির নিচতলায় সামনের অংশে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আটটি আসন বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ছয়জন নারী যাত্রী ওই বাসে যাতায়াত করছেন। এই ছয়জন বাদে ৭৪ আসনের পুরো বাসটিতে পুরুষ যাত্রী ছিলেন।

কল্যাণপুর থেকে প্রতিদিন বাসে করে কারওয়ান বাজারে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন সাইমুন নাহার। এই নারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘কর্মস্থলে যাওয়ার সময় সামনে যে বাস পাই উঠে পড়ি। এখানে বিআরটিসির বাস কখন আসবে, কখন যাবে সেটি মাথায় থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘অফিস বাদে যখন অন্যান্য সময় প্রয়োজনে বাইরে বের হই, তখন পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও সঙ্গে থাকেন। এমন অবস্থায় তাদের রেখে তো কোনো নারী একা বিআরটিসের ওই মহিলা বাসে উঠবেন না। তাই এ ধরনের লোভ দেখানো উদ্যোগ না নিয়ে, শহরের পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি; যেখানে নারীদের জন্য পৃথক বাস না রেখে, মেট্রোলের মতো শৃঙ্খলার সঙ্গে যাতায়াতের সুযোগ থাকবে।’

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা জাগো নিউজকে বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ১৪টি ‘মহিলা বাস’ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার সড়কে নামবে। এসব বাসের চালক ও তার সহকারী সবাই নারী। ফলে নারী যাত্রীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন।

এর আগে বেশ কয়েকবার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিআরটিসি, কিন্তু প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। এবার তা কতটা সফল হবে? তা জানতে চাইলে বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী শুরুতেই উদ্যোগটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘বিগত সময় নগরের নারীদের জন্য একাধিকবার পৃথক বাস সেবা চালু করেছিল বিআরটিসি। কিন্তু কোনোবারই তারা সফল হয়নি। এবারও সফল হবে না। কারণ, এ সেবা কার্যক্রম বাস্তবতার আলোকে হয় না। এখানে কোনো ধরনের সমীক্ষা, গবেষণা করা হয় না। তারা নগরে গণপরিবহনের শৃঙ্খলার মূল কাজ না করে জনগণকে ভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখে। অথচ সড়ক পরিবহন খাতে অনেক কিছু করার আছে।’

মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, ‘আওয়ামী আমলেও এমন ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে নগরবাসীর মনোযোগ ব্যস্ত রাখতো তৎকালীন সরকার। অথচ বাস রুট রেশনালাইজেশন করা জরুরি। এটা করলে নারী, শিশু, বয়ষ্ক সবাই সুবিধা পায়।’

নারীদের সামাজিক বাস্তবতার বিষয়টিও সামনে আনেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দেশের অনেক নারী বাইরে বের হলে সঙ্গে বাবা, ভাই, ছেলে বা স্বামী থাকেন। ফলে পৃথক মহিলা বাস থাকলেও তারা একা সেটিতে উঠতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।’ তার মতে, ঢাকার কর্মজীবী নারীদের জন্য মেট্রোরেলের মতো নিরাপদ, দ্রুত ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আলাদা মহিলা বাসের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।

‘মহিলা বাস’ সার্ভিস উদ্বোধন আজ

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে ঢাকা চট্টগ্রাম বগুড়া শহরে মহিলা বাস সেবার উদ্বোধন করা হবে।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বিশেষ অতিথি থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত থাকবেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক।