Image description

রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় সম্প্রতি বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা জড়িত বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুশ্চিন্তার কারণ ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার ভেঙে বের হওয়া ৭০ জন ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামিনে কারামুক্ত হয়ে হাজিরা না দেওয়া ৩৮০ জঙ্গি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে কয়েক মাসের মধ্যে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সাভারের শ্যামপুর থেকে আরিফ ওরফে ইমরানকে আটকের পর জঙ্গিদের নেটওয়ার্কের তথ্য পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। পরে অভিযানের অংশ হিসেবে গত রোববার ডেমরা থেকে বোমাসহ জুয়েলকেআটক করা হয়।

সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এটিকে অনুমাননির্ভর আখ্যা দিয়ে জানান, সরকার বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অতীতেও জঙ্গি তৎপরতাকে প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হয়েছিল। পরে সেগুলোর পেছনে সাংগঠনিক যোগসূত্র মেলে। কোনো সম্ভাব্য তৎপরতাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সত্যতা, তথ্যের উৎস এবং সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলো মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’

অনুরূপ মত দিয়ে আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর জানান, বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এদের সঙ্গে প্রশিক্ষিত লোক ও বড় বিনিয়োগ রয়েছে।

সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘বোমারু মামুনসহ কয়েকজনকে ধরা গেলে শঙ্কা কমবে। তাদের ধরতে অভিযান ও তদন্ত চলছে।’

অনেক জঙ্গি পলাতক

২০২৪ সালে দেশের কয়েকটি কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের মধ্যে ৯৮ জন ছিলেন জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক। এদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ৯ জনের ৪ জন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। পরে ২৮ জনকে আটক করা গেলেও বাকি ৭০ জনের কোনো হদিস মেলেনি। এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর জামিন পাওয়া ৩৮০ জনও আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না।

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হিযবুত তাহ্রীরের ৫৯ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের ৯ জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১ জন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার ১ জন সদস্য পলাতক রয়েছেন।

এটিইউ জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী সংগঠনের ২ হাজার ১৪৩ সদস্য গ্রেপ্তার হন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে জামিনে মুক্ত হন ১ হাজার ৬১১ জন। বর্তমানে কারাগারে আছেন ১৬২ জন। ১৬টি কারাগারে ৫৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৪৬ জন যাবজ্জীবন ও ২৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামি আছেন। বিচার চলছে ৩২ জনের। আর সিটিটিসি ২০২৫ থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ১১ জনকে আটক করেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ব্লগার, লেখক ও বিদেশি হত্যা এবং হোলি আর্টিজান হামলার মাধ্যমে মারাত্মক উগ্রবাদী তৎপরতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর আগে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬ ৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি।

জেল পলাতক জঙ্গি সক্রিয়

ডেমরার সারুলিয়ায় দুটি বোমাসহ গ্রেপ্তার জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নরসিংদী জেলা কারাগার ভেঙে পালানো জঙ্গি। সেসময় ৮২৬ বন্দি পালানোর পাশাপাশি ৮৫টি অস্ত্র ও ৮ হাজার ১৫০টি গুলি লুট হয়। ছয়দিন পর জুয়েল গ্রেপ্তার হলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বরে তিনি জামিনে মুক্ত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জুয়েল নব্য জেএমবির বোমা কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

গত রোববার বিকালে যৌথ অভিযানে ডেমরা থেকে জুয়েলকে গ্রেপ্তারের পর তার আস্তানা থেকে দুটি হাতবোমা উদ্ধার করে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহসিন মাসুদ জানান, জঙ্গি নেটওয়ার্কে জুয়েল ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত এবং সে বোমারু মামুনের সহযোগী হিসেবে সেখানে অবস্থান করছিল।

বোমা তৈরি করছে মামুন

সিটিটিসির তথ্য মতে, নব্য জেএমবির বোমা প্রশিক্ষক বোমারু মামুন ২০১৭ সালে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারামুক্ত হয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ ও সাভারে আস্তানা গড়েন। সেখানে শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জনকে নিয়ে বড় হামলার পরিকল্পনা ও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ শুরু করেন।

২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নিহত হয়। ২০১৯ সালে চার্জশিটে মামুনের নাম এলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত তাকেসহ সব আসামিকে খালাস দেয়। রায়ে বিচারক তাদেরকে ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতা-কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সবকিছুর সঙ্গে নব্য জেএমবি

সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন টাইমস’কে বলেন, কেরানীগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলা, কুমিল্লার মন্দিরে বিস্ফোরণ, যশোরে বিস্ফোরক উদ্ধার, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতা বোমা, সাভারে প্রেসার কুকার বোমা, ডেমরায় পাইপ বোমা এবং সায়েদাবাদে তল্লাশির সময় বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। কাস্টমাইজড আইইডি তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে নব্য জেএমবির সদস্যরা সরাসরি জড়িত বলে জানান তিনি।