Image description

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে তিন লাখের কিছু বেশি মানুষকে ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়ে মিয়ানমার যে নতুন বিবৃতি দিয়েছে, সেটিকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন রোহিঙ্গারা।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গাদেরকে না নেওয়ার জন্য একটা ‘নাটক’ করতেছে উনারা।”

তার মতে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার করে এবং ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে মিয়ানমার কার্যত প্রত্যাবাসন না হওয়ার পথই তৈরি করছে।

শনিবার মিয়ানমারের জান্তা সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় তিন লাখের বেশি মানুষ দেশটির রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেশে ফেরত নিতে ইচ্ছুক।

২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই বিবৃতি আসে।

তবে ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই।

মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।

তবে মিয়ানমারের এই বক্তব্যের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি বাংলাদেশ। কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, মিয়ানমারের বিবৃতিতে একদিকে প্রত্যাবাসনের আগ্রহ দেখানো হলেও অন্যদিকে এমন কিছু শর্ত ও ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

তার মতে, তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো যেতে পারে। কিন্তু এই তিন লাখই যেন পুরো প্রত্যাবাসনের শেষ না হয়, সেটিই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

“তারা যদি মনে করেন তিন লাখই আমরা নেব আর বাকিরা এখানকার না, এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, আমি মনে করি বাংলাদেশ সরকারের এটা নিয়ে কথা বলা দরকার।”

রহমান নাসির উদ্দিনের মতে, প্রত্যাবাসনের আগে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন- ফিরে গেলে রোহিঙ্গাদের জীবন ও নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, মিয়ানমারে তাদের আইনি পরিচয় কী হবে এবং সেখানে তারা মানবিক মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে কি-না।

“এ ছাড়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে কে সিদ্ধান্ত দেবে, কোন মাপকাঠি ধরে সেই সিদ্ধান্ত হবে। মিয়ানমার, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশ নাকি জাতিসংঘ, কে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘উন্নত’ হয়েছে বলে ঘোষণা করবে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।”

তিনি বলেন, “রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই আরাকান আর্মির হাতে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সামরিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রাখার মাধ্যমে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করতে পারে।

“এর মধ্যে একটা পলিটিক্স আছে। এটাকে আমরা বলি ‘হিডেন পলিটিক্স’।”

‘সন্ত্রাসী বললে যাবে কে?’

রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্লাহর আশঙ্কা, মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়াতেই প্রত্যাবাসন আটকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

তার প্রশ্ন, ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে যদি মাত্র তিন লাখকে ফেরত নেওয়ার উপযোগী বলে শনাক্ত করা হয় এবং তাদের মধ্যেও কাউকে ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় রাখা হয়, তাহলে একটি পরিবারের অন্য সদস্যরা কীভাবে ফিরবেন?

“একটা পরিবারে একজন যদি সন্ত্রাসী তালিকায় থাকে, সেই পরিবারের কি আর কেউ যাবে?”

তার মতে, রোহিঙ্গাদের সংকটের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন। মিয়ানমার তাদের রোহিঙ্গা পরিচয় স্বীকার না করায় প্রত্যাবাসনের পরও একই সংকট আবার তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি’ শর্তকেও প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সৈয়দ উল্লাহ।

“আমরা তো মনে করি, ৫০ বছরেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইতে দেবে না উনারা। এরকম পরিস্থিতি উনারা ধরে রাখবে। কীভাবে যাব তাহলে?”

‘মডার্ন ভিলেজ’ নিয়ে আপত্তি

২০১৮ সালের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়টিও তাদের উদ্বেগের।

তার দাবি, মিয়ানমারের পরিকল্পনায় ‘অরিজিনাল হোমল্যান্ড অর নিয়ারেস্ট অব ইট’ অর্থাৎ আদি বসতভিটা বা তার কাছাকাছি এলাকায় রাখার কথা বলা হলেও ‘মডার্ন ভিলেজ’ নামে এমন কিছু স্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া থাকবে।

এ ধরনের ব্যবস্থাকে তিনি ক্যাম্প বা আটককেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করেন।

“মিয়ানমারে যখন এরকম ক্যাম্প হবে এটাকে বলা যাবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা ডিটেনশন সেন্টার,” বলেন সৈয়দ উল্লাহ।

রাখাইনের সিত্তে এলাকায় ২০১২ সাল থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে বলেও দাবি করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

 

 

তার ভাষ্য, এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড বা এনভিসি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিতে গেলে তারা নাগরিকের বদলে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।

‘বাংলাদেশ এককভাবে এই তথ্য তৈরি করেনি’

মিয়ানমারের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাঙালি বলতেই পারে, এটা তাদের সংজ্ঞা। আমাদের সংজ্ঞায় আবার রোহিঙ্গারাও তাদের নিজেদেরকে বাঙালি মনে করেন না।”

মিয়ানমার কোন তথ্যের ভিত্তিতে এ দাবি করছে, তা বাংলাদেশের জানা নেই বলেও জানান তিনি।

মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। সেই জনগোষ্ঠীর পরিবার ও সদস্য সংখ্যা পরবর্তী সময়ে বেড়েছে। এখন ১২ লাখের উপরে রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

এই তথ্য বাংলাদেশ এককভাবে তৈরি করেনি জানিয়ে শরণার্থী কমিশনার বলেন, “এটা একটা যৌথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ, দুই পক্ষই একসঙ্গে করে। সুতরাং এটা তো আমাদের একক কোনো তথ্য না।”