বিদেশে থাকা নাগরিকদের মুখ বন্ধ বা ভয় দেখানোর ঘটনা আগে মানবাধিকার প্রতিবেদনে আলোচনায় আসত না। বর্তমানে তা পশ্চিমা বিশ্বের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে ৫৪ দেশের সরকার নিজ দেশের প্রবাসী নাগরিকদের মুখ বন্ধে সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালিয়েছে। শতাধিক দেশে অন্তত ১ হাজার ৩৭৫ সরাসরি শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো এখন এই হুমকি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এই গুপ্ত দমননীতির আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা তৈরি করছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার যৌথ টিম কাজ শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই হুমকির চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। ফরেন পলিসির গবেষণায় উঠে এসেছে, চীনের উইঘুর গবেষক ও অধিকারকর্মীদের ওপর দেশটির সরকারের চাপ প্রয়োগের নতুন কৌশলের কথা। উইঘুর হলো চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত জিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করা মুসলিম জাতিগোষ্ঠী।
গত এক বছরে প্রবাসীদের বশে রাখতে ‘সাধারণ ভিসা’ নামক নতুন কৌশল নিয়েছে চীনা সরকার। বাইরে থেকে ভ্রমণের অনুমতিপত্র মনে হলেও ভেতরে রয়েছে ষড়যন্ত্র।
২০১৩ সালে জার্মান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়োহানেস গার্শেভস্কি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর টিকে থাকার তিন মূল উপায়ের কথা বলেছিলেন। প্রথম উপায় হলো সরাসরি জোরজুলুম ও ভয় দেখানো (রিপ্রেশন)। দ্বিতীয় হলো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মানুষকে পক্ষে টানা (কো-অপ্টেশন)। তৃতীয় হলো প্রচারণার মাধ্যমে সরকারের সব কাজকে জনগণের কাছে বৈধ করে তোলা (লেজিটিমেশন)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু শক্তি প্রয়োগ করে কোনো সরকার বেশি দিন টিকতে পারে না। সরাসরি দমনপীড়নে বিপুল অর্থ খরচ হয়। জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা আসে না।
একই নিয়ম বিদেশের মাটিতেও কাজ করে। স্বৈরাচারী সরকারগুলো প্রবাসীদের ওপর কেবল হামলা চালায় না। বিভিন্ন সুযোগ ও সুবিধার টোপ দিয়ে প্রবাসীদের বাধ্য করার চেষ্টা করে (ট্রান্সন্যাশনাল কো-অপ্টেশন)। মিথ্যা প্রচার চালিয়ে নিজেদের শাসনকে বৈধ প্রমাণ করতে চায়। যেকোনো সরাসরি হামলার ঘটনা সহজে চোখে পড়ে বলে মানবাধিকারকর্মীরা দ্রুত প্রতিবাদ করেন। তাই সরাসরি হামলার চেয়ে গুপ্ত কৌশলই এখন এই দমননীতির নতুন অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
উইঘুরদের ওপর চালানো কার্যক্রমে চীনের এই বুদ্ধির প্রমাণ মেলে। চীন সরকার ২০১৬ সালের শেষ ও ২০১৭ সালের শুরুতে জিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের পাসপোর্ট জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের মাধ্যমে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। ২০২৩ সাল থেকে প্রবাসে থাকা উইঘুরদের জন্য জিনজিয়াংয়ের সীমান্ত খুলে দেয় চীন সরকার। তবে এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। মুখে মুখে প্রবাসীদের মধ্যে এই সীমান্ত খোলার খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ব্যাকুল মানুষ ধীরে ধীরে দেশে ফিরতে শুরু করেন।
এরপর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উইঘুরদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এক উইঘুর মানবাধিকারকর্মী জানান, ২০২৪ সালের দিকে মানুষ সমালোচনার ভয়ে এই সফরের কথা গোপন রাখত। ২০২৫ সালে এসে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চীনের কড়া সমালোচকেরাও স্বদেশে গিয়ে ফিরে আসার পর আন্দোলন ছেড়ে দিয়েছেন। কিছু উইঘুরকে আত্মীয়দের দেখতে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জিনজিয়াং এখন সবার জন্য উন্মুক্ত বলে বহির্বিশ্বে প্রচার করা হচ্ছে।
ফ্রিডম হাউসের গবেষণায় চীনের এই কৌশলকে হারানো অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রলোভন (রিস্টোরেটিভ ইনডিউসমেন্ট) বলা হয়েছে। চীন বহু বছর ধরে জিনজিয়াংকে বাকি বিশ্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। বিদেশ থেকে ফোন পাওয়ার অপরাধেও অনেক উইঘুরকে জেলে পাঠানো হয়। ফ্রিডম হাউসের সহ-গবেষক তোহতি ২০১৭ সালে নিজের দাদির সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করতে বাধ্য হন। মানুষ যখন দীর্ঘ বিচ্ছেদে চরম অসহায় হয়ে পড়ে, তখন সরকার হারানো অধিকার ফেরত দেওয়ার মিষ্টি প্রস্তাব দেয়।
উইঘুর আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান এলফিদার ইলতেবির জানান, উইঘুররা শেষবারের মতো মা-বাবাকে দেখতে সব ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে।
স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার আসল বিপদ শুরু হয় বিমানবন্দরে নামার পর। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও গোপন অডিও রেকর্ডে এই সত্য উঠে এসেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে জিনজিয়াংয়ে যাওয়া উইঘুরদের বিমানবন্দরে নেমেই পুলিশের জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। এক উইঘুর-আমেরিকান অধিকারকর্মীকে চাকরি, ব্যবসা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতির লোভ দেখানো হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বিনিময়ে আপনাকে আমাদের তথ্যদাতা (ইনফরম্যান্ট) হতে হবে। বিদেশের উইঘুর সমাজের সব খবরাখবর আমাদের জানাতে হবে। আমাদের সঙ্গে ভালো কাজ করলে আপনার মা-বাবা ও বোনকে আমেরিকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’
সেই ব্যক্তি তাতে রাজি না হওয়ায় তাঁর পরিবারকে বন্দিশিবিরে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে অন্যান্য অনেককে সরকারের প্রচারণায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।
এক তরুণীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আমেরিকায় ফিরে গিয়ে জিনজিয়াংয়ের সুন্দর অভিজ্ঞতার গল্প সবার কাছে বলতে। আরেকজনকে দিয়ে জোর করে ভিডিও বার্তায় বলানো হয়, ‘উইঘুররা খুব ভালো আছে, জিনজিয়াংয়ের ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে।’
কারও পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ইস্তাম্বুলভিত্তিক এক উইঘুর ব্যক্তি চারবার তুরস্ক সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জিনজিয়াং সফরে যান। পরে ব্যক্তিগতভাবে আরেকবার জিনজিয়াংয়ে গেলে পুলিশ তাঁকে আটক করে। বিচারে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
উইঘুর সমাজে চীনের এই মিষ্টি কৌশল বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বছরের পর বছর হুমকি দিয়েও চীন যা করতে পারেনি, এই কৌশলে তা সফল হয়েছে। প্রবাসীরা কোনো ক্ষতি ছাড়া ফিরে আসায় সাধারণ মানুষের মনের ভয় কমে গেছে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিবারের দেখা পাওয়ার জন্য মানুষ এখন চুপ থাকাকেই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করছে। রাজপথের বিক্ষোভ ও মানবাধিকার আন্দোলনে উইঘুরদের উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
মানচিত্রে হলুদাভ অংশে উইঘুর অধ্যুষিত জিনজিয়াং অঞ্চল।
দেশে যাওয়ার এই সুযোগ উইঘুরদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে। যারা দেশে যাচ্ছেন, তাদের দালাল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। যারা দেশে যাচ্ছেন না, তারা বাকিদের সন্দেহের চোখে দেখছেন। অনেক প্রবাসী এখন দ্বৈত জীবনযাপন করছেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তারা পুলিশের জেরার কথা স্বীকার করেন। সবার সামনে দাবি করেন দেশে সবকিছু স্বাভাবিক আছে। এই দোলাচল উইঘুর সমাজের ভেতরের পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে। আমেরিকায় থাকা উইঘুরদের নিজেদের ভেতরের কথাবার্তা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক একদম ভেঙে গেছে।
নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করা সমাজকর্মীরা সমাজে একা হয়ে পড়ছেন। নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখন মুখ বন্ধ রাখছেন। উইঘুর ট্রানজিশনাল জাস্টিস ডেটাবেজ আগে প্রতি সফরে ৪০ থেকে ৫০ জনের জবানবন্দি পেত। সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচজনের কথা রেকর্ড করতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।
সরকার প্রথমে জোরজুলুম করে অসহায় পরিবেশ তৈরি করে। পরে সুযোগের প্রলোভন দিয়ে সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়।
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য ফ্রিডম হাউসের গবেষণায় অপরাধের মাত্রা বা আইন লঙ্ঘনের সীমা (ট্রান্সগ্রেসিভনেস) ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়ম কতটা সরাসরি ভাঙা হচ্ছে, সেটাই এই ধারণার মূল কথা। গুপ্তহত্যা বা অপহরণ বড় ধরনের অপরাধ। এই কাজে আইন ভাঙার কারণে মামলা হয় এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া কোনো দেশের আইনে সরাসরি অপরাধ নয়। ওয়াশিংটন বা বার্লিনের আদালত এই সুযোগ দেওয়াকে বেআইনি ঘোষণা করতে পারে না। বেইজিং এমন পথ বেছে নিয়েছে যা আইন ভাঙে না, অথচ নিখুঁতভাবে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বমঞ্চে স্বৈরতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা (ইমেজ ম্যানেজমেন্ট)। সমালোচকদের থামিয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে নিজেদের এক সুন্দর ও শান্তির রূপ তুলে ধরতে চায় চীন।
২০২২ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং দেশটির গণমাধ্যমকে নির্দেশ দেন, জিনজিয়াং নিয়ে নিয়মিত ভালো খবর প্রচার করতে। চীন এরপর জিনজিয়াংয়ের ভাবমূর্তি সাজাতে বিপুল অর্থ খরচ করছে। গত জানুয়ারিতে তুরস্কে থাকা ৪২ জন উইঘুরকে বিশেষ সফরে জিনজিয়াং ঘুরিয়ে এনেছে কমিউনিস্ট পার্টি। সরকারের উন্নয়ন প্রচার করাই ছিল এই সফরের মূল লক্ষ্য।
গবেষক সের্গেই গুরিয়েভ ও ড্যানিয়েল ট্রেইসম্যান এই ধরনের শাসকদের ধূর্ত প্রচারক স্বৈরশাসক (স্পিন ডিক্টেটর) বলেছেন। এই শাসকরা সরাসরি বন্দুক দিয়ে ভয় দেখানোর চেয়ে মানুষের চিন্তাকে গোপনে নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসেন, বাইরে থেকে দেখলে যা একদমই স্বাভাবিক মনে হয়।
অন্যান্য স্বৈরাচারী দেশও বিদেশের মাটিতে এই কৌশল কাজে লাগাচ্ছে। ইরিত্রিয়া দূতাবাসের সেবা ও সম্পত্তির অধিকার দেওয়ার বিনিময়ে প্রবাসীদের ওপর কর চাপিয়ে দেয় এবং রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করে। বেলারুশ সরকার ২০২৩ সালে একটি বিশেষ কমিশন বানায়। ক্ষমা চেয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের সরকারের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য করা হয়। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের সময় দেশে ফেরা শরণার্থীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চাপিয়ে দেয়। রুয়ান্ডা সরকার প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সফরের আয়োজন করে আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা করে। স্বদেশে ফেরার শর্ত দিয়ে ভিন্নমত দমন করা এখন বিশ্বজুড়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন না ভেঙে কাজ করার এই কৌশলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যায় না। ভাড়াটে খুনিদের বিচার করা গেলেও অধিকার ফেরত দেওয়ার মিষ্টি ফাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। পশ্চিমা দেশগুলো এখন সীমান্তপারের নির্যাতন বন্ধে আইন তৈরির চেষ্টা করছে। পুরোনো দিনের হামলার কথা ভেবে বানানো এই আইনগুলো চীনের নতুন কৌশলের সামনে কার্যকর হবে না। আগামী দিনে সীমানা পেরিয়ে বড় বড় নির্যাতনের ঘটনা হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রতিবেদনেও প্রকাশ পাবে না।