যে কোনো মুহূর্তেই ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে যাচ্ছে। এখন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে কমিটির চূড়ান্ত ফাইল। এরই মধ্যে গুঞ্জন, বরাবরের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকেই সাজানো হচ্ছে ছাত্রদলের ‘সুপার ফাইভ’। এ অবস্থায় ঢাবি শিক্ষার্থী না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান।
আজ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তিনি। এতে লিখেছেন, ঢাবি শিক্ষার্থী হলে বৃহৎ পরিসরে ছাত্র রাজনীতির স্বপ্নের যাত্রা শুরু করতে পারতেন।
‘ছাত্র রাজনীতি করার অপূর্ণ স্বপ্নের এক গভীর আক্ষেপ’ শিরোনামে দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে আব্দুল্লাহ আল নোমান লিখেছেন, ‘আজ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতাম—বৃহৎ পরিসরে ছাত্র রাজনীতির আরেক স্বপ্নের যাত্রা হয়ত শুরু করতে পারতাম।’
নিজের সংগ্রামী জীবনের বিবরণ তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিনের গুম, খুন, মামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। সেই ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল জুলাই আন্দোলন। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিলে অংশ নিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের আন্দোলনের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় এবং শহীদ ওয়াসিম জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ছাত্রদলের গর্বের বিষয়।’
আব্দুল্লাহ আল নোমান আরও লিখেছেন, ‘আন্দোলনের সময়ে নিজের পা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও ক্র্যাচে ভর দিয়ে নিজ পায়ে হেঁটে আন্দোলনকে চলমান ও বেগবান রাখার সহ-যোদ্ধাদের নিয়ে চেষ্টা করেছি। দিন কিংবা রাতের পর রাত রাজপথে কেটেছে। শরীরের ওপর দিয়ে অসহনীয় নির্যাতন, কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি। একজন কর্মী হিসেবে সেই সময়গুলো আমার জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল, তেমনি ছিল দায়িত্ব পালনের এক গভীর উপলব্ধি।’
‘আজ যদি ঢাবির শিক্ষার্থী হতাম—রাজনীতি আরেকভাবে করার স্বপ্ন ছিল’ উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, আজ যদি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হতাম এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো আরও বৃহৎ পরিসরে মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও ছাত্রসমাজের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ পেতাম। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এই আক্ষেপ অবশ্যই আছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে ছাত্ররাজনীতি করার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ হয়তো জীবনের কোথাও থেকে যাবে। তবে সেই আক্ষেপের চেয়েও বড় আমার দায়িত্ববোধ। কারণ রাজনীতিতে পদ-পদবি নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্যাগ স্বীকার করা এবং কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করাই একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয়।’
তবে রাজপথের কর্মী হিসেবে কোনো অনুশোচনা নেই বলেও উল্লেখ করেছেন নোমান। লিখেছেন, ‘ক্র্যাচে ভর দিয়ে নিজের পা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও রাজপথে থাকার চেষ্টা করেছি। রাতের পর রাত আন্দোলনের মাঠে কেটেছে। শরীরের ওপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে, কিন্তু মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাইনি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার আক্ষেপ থাকলেও রাজপথের কর্মী হিসেবে নিজের ভূমিকা নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’
৫ আগস্টের পর আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের রাজনীতির পরিবর্তে প্রয়োজন দায়িত্বশীল, সহনশীল ও গঠনমূলক ছাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ক্ষমতা বা প্রভাব পাওয়া মানেই প্রতিপক্ষকে দমন করা নয়। বরং দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে ভিন্নমতকে সম্মান করা, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত নতুন ছাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ছাত্ররাজনীতির প্রত্যয় প্রসঙ্গে চবি ছাত্রদলের এই নেতা লিখেছেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নিরাপদ, শিক্ষাবান্ধব ও স্বাভাবিক ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির অর্থ শুধু মিছিল-মিটিং নয়; শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা, তাদের বাস্তব সমস্যার পাশে দাঁড়ানো এবং সব মতের শিক্ষার্থীর নিরাপদ সহ-অবস্থান নিশ্চিত করাও ছাত্ররাজনীতির দায়িত্ব। ক্ষমতাসীন অবস্থানে থেকেও দখলদারিত্ব না করা, হল বা ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার না করা, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের হয়রানি না করা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক সহযাত্রী হিসেবে দেখাই হতে পারে নতুন ছাত্ররাজনীতির প্রকৃত পরিবর্তন।’
দীর্ঘ পোস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ওয়াসিম আকরামকে স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, ‘শহীদ ওয়াসিমের আত্মত্যাগ, জুলাইয়ের সংগ্রাম এবং রাজপথে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ যেন শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে—সেই প্রত্যয়েই এগিয়ে যেতে চাই। আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের অধিকার থাকবে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে, ক্যাম্পাস হবে শিক্ষাবান্ধব, ভিন্নমতের প্রতি থাকবে সম্মান এবং রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য।’
আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত সুন্দর বাংলাদেশ, সবার আগে বাংলাদেশ—উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘সেই বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রত্যয়ে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। কারণ আমার কাছে রাজনীতি কোনো পদ-পদবির প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানুষের জন্য, দেশের জন্য এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আজীবন দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।’