Image description

ফেনী সদর উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগে বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

তবে উপজেলা প্রশাসনের দাবি, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র ৪৫ দিনের অস্থায়ী একটি নিয়োগকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াকে ‘বিব্রতকর’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউএনও।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনও কার্যালয় চত্বরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আইয়ুব আলী, সদস্যসচিব কাজী কামরুল, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর নবী মেম্বার, লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রিপন মেম্বার, ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর আলম, ফাজিলপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একরামুল হক এবং মোটবী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

বিক্ষোভকারী বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুমারি কর্মসূচিতে ফেনী সদর উপজেলায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার পরিবর্তে অনিয়ম ও পক্ষপাতের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এতে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।

তারা বিতর্কিত নিয়োগের ফলাফল বাতিল করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।

বালিগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব কাজী কামরুল বলেন, ‘সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই অচেনা। আমাদের অনেক শিক্ষিত ছেলে পরীক্ষা দিলেও তাদের নাম আসেনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মহিলা লীগ ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী রয়েছেন। এমনকি নির্বাচনে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট ছিলেন—এমন লোকজনও আছেন। আমরা চাই, এমন দলীয় লোক নিয়োগ না দিয়ে দলের বাইরের শিক্ষিত ছেলেদের নিয়োগ দেওয়া হোক।’

তিনি আরও বলেন, নিয়োগের পরীক্ষা কার্যক্রম নিয়েও তাদের প্রশ্ন রয়েছে। বিক্ষোভের সময় ইউএনওকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

কাজী কামরুল বলেন, আগামী রোববার বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ইউএনওর সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগ দেবে। প্রতিকার না পেলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

একই ধরনের অভিযোগ করেন লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম। তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ না দিয়ে নানা অনিয়ম করায় ১২টি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা মিলে এ কর্মসূচি দিয়েছেন। বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ফেনী সদর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আমান উদ্দিন কায়সার অভিযোগ করে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের শুমারি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশাসনের লোকজন আবার আওয়ামী লীগের লোকদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।’

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এমপি জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও ইউএনও তাদের কথা শুনছেন না।

আমান উদ্দিন আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’

ফেনী সদর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) শুমারিকালীন তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাওয়া বৈধ আবেদনকারীদের শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরপর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত, রিজার্ভ ও অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, জাতীয় পর্যায়ের ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারি নির্দেশিকা’ অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব কাজ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সবসময় সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে সভাও করেছেন।

তিনি বলেন, ‘যারা আবেদন করেছেন, তাদের মধ্য থেকে স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

দলীয় লোকজন বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ নাকচ করে ইউএনও বলেন, ‘দলীয় লোকজন, বিশেষ ব্যক্তির তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ বা অনিয়মসহ যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। নিয়োগ কমিটি মেধার ভিত্তিতে ও জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী লোকবল নিয়োগ দিয়েছেন।’

মাত্র ৪৫ দিনের অস্থায়ী নিয়োগকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এমন একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও যদি এত অভিযোগ থাকে, তাহলে তো সমস্যা। সবকিছু মিলিয়ে এমন কাণ্ড আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।’

বিক্ষোভের খবর পেয়ে তিনি অফিস থেকে চলে গিয়েছিলেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘আমি তখন অফিসে ছিলাম না। পূর্বনির্ধারিত সভায় যোগ দিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ছিলাম।’ 

News

 

মিছিলকারীদের পক্ষ থেকে তাকে ফোনকল বা লিখিতভাবে কিছু জানানো হয়নি বলেও জানান তিনি।

ইউএনও বলেন, ‘পরবর্তী ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন বলে শুনেছি। তাদের মধ্যে ২-৩ জন সন্ধ্যায় আমার অফিসে এসে ক্ষমা চেয়েছেন। তারা এটি ঠিক করেননি বলেও মন্তব্য করেছেন।’

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ ও প্রশাসনের পাল্টা বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে রোববার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।