নিউ মার্কেটের নতুন ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধন হয় চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। উদ্বোধনের সময় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছিলেন, ‘ব্রিজটিতে অবৈধ হকার বা দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়া হবে না।’ তবে এখনো ছয় মাস হয়নি উদ্বোধনের। এর মধ্যেই মানুষের হাঁটার বদলে হকারদের দখলে গেছে ব্রিজটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজটির দুই পাশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন হকার অস্থায়ী দোকান বসিয়েছেন। শিশুদের খেলনা, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, মোবাইল ফোনের কভার, চার্জার, প্রসাধনী, ঝালমুড়ি, বিভিন্ন খাবারসহ বিক্রি হচ্ছে নানা পণ্য।
পথচারীদের হাঁটার জায়গার সিংহভাগই দোকানপাটের দখলে। মাঝখানে কেবল সরু একটি অংশ ফাঁকা। তাতে পথচারীদের চলতে হচ্ছে একে অপরের গা ঘেঁষে। অথবা বিপরীত দিকের ব্যক্তির চলার পথ দেওয়ার জন্য থামতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও ব্যাগ বহনকারীরা দৈনন্দিন ভোগান্তিতে পড়ছেন।
পথচারীদের ভাষ্য, হকারদের কারণে ওভার ব্রিজটিতে হাঁটা চলায় ভোগান্তিতে পোহাতে হয়। আফসানা আক্তার নামে এক পথচারী বললেন, ‘প্রথম দিকে ব্রিজটিতে কোনো হকার বসত না। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই হকাররা আবার বসতে শুরু করেছে। ব্রিজের দুই পাশেই এমনভাবে হকাররা বসেছে যে হাঁটার রাস্তা একদম সরু হয়ে গিয়েছে। আবার সেই দোকানগুলোতে কেউ কিছু কিনতে নিলে পুরো রাস্তাই ব্লক হয়ে যায়। তখন পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।’
সেখানকার এক হকার সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘পরিবার চালানোর জন্য এখানে ব্যবসা করি। ফুটপাতে অভিযান চালানো হলে আমাদের অন্য জায়গা খুঁজতে হয়। আমাদের কোথাও বসতে না দিলে আমরা কীভাবে চলব? আমাদের তো কোথাও না কোথাও বসার ব্যবস্থা করতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউ মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ করার পর ব্রিজটিতে হকার বেশি এসেছে। প্রথম তিনমাসে চার-পাঁচটি অস্থায়ী দোকান ছিল, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দোকান সংখ্যা। এখন হকারে ভরে গেছে। বেশি চাঁদা দিয়ে তারা ব্রিজটিতে উঠতে পেরেছে। এর জন্য নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। সেই টাকা বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে যায়।’
হকারদের পুরো দখলে ছিল নিউ মার্কেটের পুরনো ফুটওভার ব্রিজটি। ছিল জরাজীর্ণ অবস্থায়। উপযুক্ত ছিল না ব্যবহারের। সব মিলিয়ে পথচারীরা উঠতেই চাইতেন না ব্রিজটিতে। তাই যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমাতে পুরনো ব্রিজটি পুরোপুরি ভেঙে নতুন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড (ডিইডব্লিউ)। ৪২ মিটার দীর্ঘ এবং ২০ ফুট প্রশস্ত এই ব্রিজের কাজ ২০২৫ সালের অক্টোবরে শেষ হয়।
পথচারীদের, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের যাতায়াত সহজ করতে এতে চলন্ত সিঁড়িও (এস্কেলেটর) যুক্ত করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হলেও এর মধ্যে হকাররা জায়গাটি দখল করতে শুরু করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেতু মন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস রক্ষা করা হয়নি।
হকারদের বারবার ফিরে আসা প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা প্রতিনিয়তই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। কিন্তু উচ্ছেদের আধাঘণ্টার মধ্যেই হকাররা আবার দোকান বসায়। সরকার হকারদের জন্য জায়গা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ধানমন্ডিতে তাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে কার্যকরভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো যাবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসানের মতে, ‘প্রথমেই উদ্দেশ্য বুঝতে হবে যে প্রকল্পটি কেন করা হয়েছে। এটি হকারদের জন্য নাকি পথচারীদের পারাপারের জন্য। যদি পথচারীদের সুবিধার কথা ভেবে নির্মাণ করা হয়, তবে হকারদের বসতে দিলে পারাপারে সমস্যা হবেই।’
তিনি বললেন, ‘পরিকল্পনা করার আগে ওই এলাকার হকারের সংখ্যা বিবেচনায় আনতে হবে। নিউ মার্কেট এলাকায় অনেক হকার রয়েছে। সেই এলাকার হকারের সংখ্যা কেমন সেটি বিবেচনায় আনতে হবে। হকারদের বিবেচনায় না রাখলে ফুটওভার ব্রিজ এলোমেলো অবস্থায়ই থাকবে। বারবার অভিযান চালিয়েও এটি সুশৃঙ্খল অবস্থায় আনা যাবে না।’
‘তাদের কোনো সংস্থার আওতায় এনে বা আলাদাভাবে পুনর্বাসনের কাজ করা গেলে সুসংগঠিত সমাধান সম্ভব। নইলে সব রাস্তার ফুটপাত এবং ওভার ব্রিজ এলোমেলো অবস্থায়ই থাকবে,’ যোগ করেন শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান।