Image description

আমন্ত্রণ রয়েছে, তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেই ঢাকার তরফে বলা হচ্ছে। তার মধ্যেই ভারতের সংবাদ মাধ্যমে খবর এল, দিল্লি সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এনডিটিভি আজ শুক্রবার এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমান নয়াদিল্লি সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তার এ সফরকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে দিল্লি ও ঢাকার সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সফরটি হলে তা হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। এটি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারে।

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নাজুক হয়ে পড়ে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার নানা পদক্ষেপও প্রভাব ফেলে তাতে।

এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণের চিঠি দেওয়া হয় গত মাসে।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য নয়; বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে।

এমন আমন্ত্রণে ঢাকা যে সন্তষ্ট নয়, তা ধরা পড়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কথায়। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে না, চেয়ারপারসন অব বিমসটেককে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।’

এরপর গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে, আবার ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এরপর তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, সফরের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক হলেও দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে তিনি একই সঙ্গে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফরের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের অনেক জটিল সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়।

এদিকে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা নয়া দিল্লিতে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করার পর তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর আগে তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার বিরোধিতায় সরব হন জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গতকাল এক সভায় বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কীভাবে হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নিরূপণ হবে— এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত সোমবার ঢাকায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন।-পিআইডিতার একদিন পরই তারেক রহমানের ভারত সফরের খবর এল এনডিটিভিতে; যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

মোদির সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা কী নিয়ে

এনডিটিভি জানিয়েছে, সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন তারেক রহমান।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠতে পারে। তাতে ফেরত পাঠাতে ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নয়া দিল্লির কাছে অনুরোধ রাখা হয়েছে। তবে ভারত সরকার বলছে, এই অনুরোধ বিবেচনার ক্ষেত্রে দিল্লি ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া’ পর্যালোচনা করছে।

এনডিটিভি জানিয়েছে, তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বৈঠকেও প্রত্যর্পণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। দুই সরকারকেই এখন এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যাতে এই বিরোধ বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নানা বিষয়ের সঙ্গে স্থলসীমান্ত এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, চুক্তিটি নবায়ন নিয়ে আলোচনা ততই গুরুত্ব পেতে পারে। এছাড়া তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে প্রায় এক যুগ ধরে।

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে ভারতীয় সহযোগিতাও ঢাকা চেয়েছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।

‘তাৎপর্যপূর্ণ’ সফর

তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই ভারত সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছে এনডিটিভি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও নতুন করে সাজাতে হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে গড়ালেও বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে দিল্লি মনে করছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লি সফর, দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক সম্পর্ক উন্নতির লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনডিটিভি বলছে, দুই পক্ষই যখন সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে, ঠিক এমন সময় এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সফরটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সব বিরোধের সমাধান করবে—এমনটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে না। তবে মোদি ও তারেক রহমানের সরাসরি আলোচনা নানা মতপার্থক্য নিরসনে একটি রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে ঢাকার অবস্থান সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। আবার মোদির জন্য এটি হবে নতুন বাংলাদেশ সরকারের কাছে নয়াদিল্লির প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরার একটি সুযোগ।