ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বর্তমানে দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত দীর্ঘ এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নেই। বিপরীতে ভারত আন্তর্জাতিক সীমারেখা বা জিরো লাইন থেকে প্রায় দেড়শ গজ ভেতরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করায় দুদেশের মাঝখানে তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত এলাকা।
সীমান্তবাসীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এসব উন্মুক্ত অংশ নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র। একই পথ দিয়ে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, ভোগ্যপণ্য, গবাদিপশু ও অন্যান্য চোরাই মালামাল দুদেশের মধ্যে আনা-নেওয়া হচ্ছে।
উন্মুক্ত এই সীমান্ত এখন শুধু চোরাচালানের পথ নয়, মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তের অনেক স্থানে আন্তর্জাতিক সীমারেখা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত নয়। পর্যাপ্ত সীমান্ত পিলার, সাইনবোর্ড কিংবা দৃশ্যমান চিহ্নের অভাবে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক, জেলে ও সাধারণ মানুষ অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার কাছাকাছি চলে যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ কারণে অতীতে বহু বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে আটক, নির্যাতন কিংবা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আমার দেশ-এর কয়েক মাসের অনুসন্ধানে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চোরাচালানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, অবৈধ পণ্য পরিবহনের রুট, সীমান্তকেন্দ্রিক বাজার ও নিরাপত্তাঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে।
সরেজমিন পরিদর্শন, ভিডিও ও আলোকচিত্র সংগ্রহ এবং স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও বিজিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এসব সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত আগ্নেয়াস্ত্র, ভারতীয় ভোগ্য, শিল্প ও কৃষিপণ্য, মাদক, ওষুধ, মদ, গবাদিপশুসহ অন্যান্য চোরাই পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকেও মাছ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, ঢাকাই জামদানি, মসলিন এবং বিদেশ থেকে চোরাপথে আসা স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরামে পাচার হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
গড়ে উঠেছে আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সেখানে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, মাছ ও খাদ্যপণ্যের দীর্ঘদিনের বাজার রয়েছে। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয় এবং পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে একই ধরনের পণ্য কম সময়ে ও কম খরচে সংগ্রহ করা সম্ভব। এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আন্তঃসীমান্ত চোরাকারবারি চক্র অবৈধ বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন (পিএসসি) আমার দেশকে বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তার দুর্বলতা শুধু চোরাচালানের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। সীমান্ত দিয়ে অবাধে বিদেশি পণ্য, মাদক, অস্ত্র ও নিষিদ্ধ সামগ্রী প্রবেশ করলে এবং সীমান্ত এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি, শিল্প, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উন্মুক্ত সীমান্তে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং শেরপুরের ভারতীয় সীমান্তজুড়ে কোথাও পাহাড়ি টিলা, কোথাও ঘন বনাঞ্চল, কোথাও নদী-ছড়া আবার কোথাও বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত জমি। দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় পুরো সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্তবাসীদের ভাষ্য, দিনের তুলনায় গভীর রাতেই এসব পথে অবৈধ যাতায়াত বেশি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ি পথ, নদীপথ, কালভার্ট, ঝোপঝাড় ও উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবহার করে নিয়মিত পণ্য আনা-নেওয়া করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বিলডোরা ইউনিয়ন, ধোবাউড়া সীমান্ত, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকা দ্বিমুখী অবৈধ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব পথ দিয়ে ভারত থেকে ভোগ্যপণ্য, মাদক, বিদেশি মদ, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। একই ভাবে বাংলাদেশ থেকেও মাছ, কৃষি ও খাদ্যপণ্য, সুপারি, প্লাস্টিক সামগ্রী ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতের মেঘালয়ে পাঠানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী পার হলেই ভারতের বাঘমারা এলাকা। নদীপথ ও সংলগ্ন উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবহার করে একদিকে যেমন ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশি বিভিন্ন পণ্যও অবৈধভাবে ভারতে যাচ্ছে।
ধোবাউড়া বাজারের ব্যবসায়ী শাহীন মিয়া বলেন, শুল্ক ও কর পরিশোধ না করে চোরাপথে আসা পণ্য কম দামে বিক্রি হওয়ায় বৈধ আমদানিকারক, দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় উৎপাদকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কলমাকান্দার মুদি ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, ৫০ কেজি ওজনের একটি চিনির বস্তা ভারত থেকে প্রায় চার হাজার ২০০ টাকায় সংগ্রহ করা হয়। বহন, শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত আনতে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। এরপর সীমান্তবর্তী এলাকায় সেটি প্রায় পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র ও মাদক
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে সীমান্ত ব্যবহার করে বিদেশি পিস্তল, রিভলবার, সাবমেশিনগান (এসএমজি), একে-২২, একে-৪৭-সহ বিভিন্ন অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ম্যাগাজিন, বিভিন্ন ক্যালিবারের গুলি, কার্তুজ ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম চোরাপথে বাংলাদেশে আনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু নিষিদ্ধ উপকরণও এই পথে আসছে। একই সীমান্তপথে ফেনসিডিল, ইয়াবা, বিদেশি মদ, জাল মুদ্রা, গরু, সীমান্ত এলাকায় চলাচলে ব্যবহৃত অবৈধ মোটরসাইকেল এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী প্রবেশ করছে।
এছাড়া চোরাপথে আসা পণ্যের তালিকায় রয়েছেÑচিনি, জিরা, মরিচ, হলুদ, গুঁড়াদুধ, বিস্কুট, চকলেট, জুস, প্রসাধনী, সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট, খেলনা, মোবাইল ফোন ও যন্ত্রাংশ, রেডিও-টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ, সাইকেল ও মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ, সুতা, মিক্সড ফেব্রিক্স, থ্রি-পিস, কম্বল, জুতা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, নিউজপ্রিন্ট, ক্রাফট পেপার, সিগারেট পেপার, ফরমিকা শিট, সিরামিক পণ্য, স্যানিটারিওয়্যার, স্টেইনলেস স্টিলের সামগ্রী, মার্বেল স্ল্যাব, টাইলস ও তামাকজাতসহ অসংখ্য ভোগ্য ও শিল্পপণ্য।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্ত অতিক্রমের পর এসব পণ্য মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ইজিবাইক, পিকআপ ও অন্যান্য ছোট যানবাহনে করে দ্রুত ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় অনেক ক্ষেত্রে বহনকারীরা অবৈধ মোটরসাইকেল ও পণ্য ফেলে পালিয়ে যায়।
ওষুধ ও কাশির সিরাপের চোরাচালান
সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় চিনি, প্রেসক্রিপশন ওষুধ এবং নেশাজাতীয় কাশির সিরাপও অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চোরাকারবারি চক্রের এক সদস্য জানান, ভারতীয় থ্যালিডোমাইড ক্যাপসুল, ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ডোপামিন ইনজেকশন, বিভিন্ন ব্যথানাশক ও স্নায়ুরোগের ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ব্রনোকফ-সি, চকো প্লাস ও উইন কোরেক্সের মতো কাশির সিরাপ চোরাপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারের রসিদে চোরাই গরুর বৈধতা
অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, প্রায় প্রতি রাতেই ভারতের মেঘালয় ও ডাউকি সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন অরক্ষিত রুট ব্যবহার করে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আনা হয়। পরে নির্জন স্থানে গরুগুলো জড়ো করে ছোট ট্রাক, পিকআপ কিংবা অন্যান্য যানবাহনে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে পাঠানো হয়। ভারতীয় এসব গরু বৈধ দেখাতে সীমান্তবর্তী অস্থায়ী বাজার ও পশুর হাটের ইজারাদারদের কাছ থেকে গরু বিক্রির রসিদ সংগ্রহ করা হয়। পরে গরুর সঙ্গে ওই রসিদ দেখিয়ে সীমান্তবর্তী সড়কের চেকপোস্ট পার করা হয়।
কলমাকান্দার লেংগুরা ইউনিয়নের জুবায়ের মাহমুদ বলেন, চোরাপথে আসা গরু তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লেংগুরার অনেক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভারতীয় গরুর ব্যবসা করে আজ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
মানবচুলও চোরাই পণ্যের তালিকায়
সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে কাটা বা পরিত্যক্ত মানবচুল পাচারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এসব চুলের একটি অংশ স্থানীয় কারখানায় ব্যবহার হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়।
উইগ শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন, কৃত্রিম দাড়ি-গোঁফ ও আইল্যাশ তৈরির শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশীয়ভাবে সংগৃহীত চুল দিয়ে চাহিদা পূরণ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় মানবচুলের ওপর নির্ভরশীল ছিল এই শিল্প। তবে ভারত কাঁচামাল হিসেবে মানবচুল রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করার পর সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে চুল আনার প্রবণতা বেড়েছে। চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশের উৎপাদনকারীরাও বাংলাদেশ থেকে মানবচুল ও উইগ সংগ্রহ করছেন।
আমার দেশ-এর সরেজমিন অনুসন্ধানে নেত্রকোনা ৩১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের বিজয়পুর কোম্পানি সদর ক্যাম্পসংলগ্ন সড়ক ব্যবহার করে দিনে বহুবার ভারতীয় পণ্যবোঝাই অটোরিকশা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। একই রুট ব্যবহার করে আগ্নেয়াস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রীও দেশে আনা হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সীমান্তে গড়ে উঠছে ভারতীয় পণ্যের বাজার
শুধু সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য প্রবেশই নয়, এসব পণ্য বিক্রির জন্য সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে অস্থায়ী ও স্থায়ী বাজার বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভারতীয় বিভিন্ন চোরাই পণ্য এসব বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। কম দামে পণ্য পেতে আশপাশের জেলা তো বটেই, দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ক্রেতারা নিয়মিত এসব বাজারে আসছেন। ফলে সীমান্তকেন্দ্রিক এসব বাজার ধীরে ধীরে চোরাপথে আসা পণ্যের বড় বিপণন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গাবরাখালী গারো পাহাড় পর্যটন কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা ও নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় এমন বাজারের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব বাজারে বিপুলসংখ্যক ক্রেতার সমাগম ঘটে। অনেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কিনলেও একটি বড় অংশ পাইকারি দরে পণ্য কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছে পণ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং শেরপুর সীমান্ত দিয়ে শুধু ভারতীয় পণ্যই বাংলাদেশে প্রবেশ করছে না; বরং বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে ভারতে যাচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছেÑবিদেশ থেকে অবৈধ পথে আনা স্বর্ণ, রুপা, ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শুঁটকি, ধান, চাল, আলু, বিভিন্ন কৃষিপণ্য, খাদ্যসামগ্রী এবং মেলামাইন ও প্লাস্টিক পণ্য।
এছাড়া সীমান্তবর্তী নদীপথ দিয়ে বাংলাদেশি মাছ ভারতের মেঘালয়ে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো পূর্ব খাসি পাহাড়, পশ্চিম খাসি পাহাড়, দক্ষিণ গারো পাহাড়সহ মেঘালয়ের বিভিন্ন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর বাজারে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মাছ প্রবেশ ঠেকাতে সম্প্রতি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় ও পশ্চিম খাসি পাহাড় জেলা প্রশাসন বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বাংলাদেশি মাছ পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল হাজং আমার দেশকে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ পণ্য পাচারের পেছনে দুদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার দালাল, বহনকারী এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের কিছু ব্যক্তি, এমনকি কিছু বিজিবি ও পুলিশ সদস্য এবং সংবাদকর্মীর সম্পৃক্ততা নিয়েও সীমান্ত এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া সীমান্তের ভারতীয় অংশের অনেক বাসিন্দা এমনকি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সদস্যরাও বাংলাদেশি চালের ভাতের প্রতি আগ্রহী। এ কারণে বাংলাদেশি চালও অবৈধভাবে ভারতে পাচার হয়।
সীমান্তকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং শেরপুর সীমান্তে চোরাচালান এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একদিকে যেমন ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্য ভারতে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু রাজস্ব হারানো নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা, দেশীয় শিল্প ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন (পিএসসি) আমার দেশকে বলেন, গত ১৭ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতের একতরফা প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুদেশের বিদ্যমান চুক্তি, সীমান্ত নির্দেশিকা ও পারস্পরিক সমঝোতার প্রতি সম্মান দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিএসএফের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাগুলোও দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মানবিক ও কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, সীমান্তে আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুদেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্তে সংঘটিত গুরুতর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, বাজারব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অবৈধভাবে বিদেশি পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। এতে স্থানীয় উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে মাদক ও অবৈধ পণ্যের বিস্তার তরুণ সমাজ ও আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক। সীমান্তে কার্যকর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
বিজিবির বক্তব্য
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ময়মনসিংহ সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়কদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল আজিম বায়েজিদ বলেন, তার দায়িত্বাধীন প্রায় ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্তে বিশেষ করে বিদেশি মদ (লিকার) ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট চোরাচালানের প্রবণতা রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি সফল অভিযানের পর ট্যাপেন্টাডল চোরাচালান কিছুটা কমেছে বলেও জানান তিনি। সীমান্তে জনবল বৃদ্ধি এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে চোরাচালান আরো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
নেত্রকোনা ৩১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী বলেন, তার দায়িত্বাধীন প্রায় ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের বড় অংশই দুর্গম ও উন্মুক্ত। সীমিত জনবল নিয়ে পুরো সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন। এ সুযোগে চোরাকারবারিরা বিভিন্ন বিকল্প রুট ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য আনা-নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিজিবি নিয়মিত অভিযান, টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে চোরাচালান দমনে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সীমান্তবাসী ও ব্যবসায়ীদের মতে, সীমান্ত নিরাপদ করা না গেলে শুধু চোরাচালানই বাড়বে না; জাতীয় রাজস্ব, বৈদেশিক মুদ্রা, দেশীয় শিল্প, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে শুধু নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্ব হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, বাণিজ্য, কাস্টমস, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।