Image description

স্কুল ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির (গভর্নিং বডি) হাতে আবার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এই সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে শিক্ষা খাতে নতুন করে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে এবং শিক্ষার মান আরও নিচে নেমে যাবে।

এমনিতেই গত সোমবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার খারাপ ফলাফলের পর শিক্ষার মান নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কিছু কর্মকর্তা একজোট হয়ে এই অনিয়মের পথ তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এই ব্যবস্থার বদলে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার বিরোধিতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘গভর্নিং বডির হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হবে একটি মহাবিপর্যয়। এনটিআরসিএর বিদ্যমান ব্যবস্থা তুলে না দিয়ে বরং এর আরও সংস্কার করা দরকার। প্রয়োজনে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) আদলে একটি স্বাধীন শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশন শুধু প্রার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান নয়, তাদের আচরণ ও মানসিকতাও যাচাই করবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় পুরোনো ব্যবস্থা ফেরানোর বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হতেই সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক সংগঠনগুলোও রাজপথে নামার হুমকি দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

নেপথ্যে নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ

এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭৫ হাজার ৭৬২টি পদ খালি রয়েছে।

গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক সভায় গভর্নিং বডিকে দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করানোর প্রস্তাব তোলা হয়। সেখানে বলা হয়, এনটিআরসিএ শুধু পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেবে, কিন্তু কোনো শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না। গভর্নিং বডি যাতে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারে, সে জন্য পরিপত্র জারিরও প্রস্তাব তোলা হয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী মহাজোটের সদস্য সচিব দেলোয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘প্রায় ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠানে ৮০ হাজার খালি পদ রয়েছে। এই নিয়োগের ক্ষমতা গভর্নিং কমিটির হাতে দেওয়া মানে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক চিন্তাভাবনা।’

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদার বলেন, গভর্নিং কমিটির সীমাহীন অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের কারণেই ২০১৫ সালে এই ক্ষমতা এনটিআরসিএ’র হাতে দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার পুরোনো ব্যবস্থা ফেরানো হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ২০১৫ সালের আগের সেই অন্ধকার ও অনিয়মের যুগে ফিরে যাবে।

সভাপতিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের চেষ্টা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গভর্নিং কমিটির সভাপতি হতে হলে অন্তত স্নাতক (ডিগ্রি) পাস হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এই নিয়মটি তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। পরে শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের তীব্র বিরোধিতার মুখে সরকার সে অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তৎকালীন গভর্নিং বডির সদস্যরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটির নিয়ন্ত্রণে আসেন বিএনপি নেতা ও তাদের অনুসারীরা।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন করে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক নেতাদের চাপেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় আবার গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা চিন্তা করছে।

কয়েকটি স্কুলের গভর্নিং কমিটির বর্তমান সভাপতিরাও স্বীকার করেন, ২০১৫ সালের আগে যেসব শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের অনেকেরই যোগ্যতার ঘাটতি ছিল। কারণ তখন ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে চাকরি পেতেন অনেকে। পরবর্তীতে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে একাধিক ধাপে পরীক্ষা দিয়ে যোগ্য শিক্ষকরা আসতে শুরু করলে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হতে থাকে। এখন যদি আবার পুরোনো নিয়ম ফিরিয়ে আনা হয়, তবে স্কুল-কলেজগুলো আবারও রাজনৈতিক প্রভাব ও লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

শিক্ষকদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

দেলোয়ার হোসেন আজিজী মনে করেন, ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারই নিয়োগে শৃঙ্খলা আনতে এনটিআরসিএ গঠন করেছিল। পরে ২০১৫ সাল থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নিয়োগ শুরু হয়। সবার আশা ছিল বর্তমান সরকার বিসিএস বা পিএসসি’র মতো এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করবে। কিন্তু তার বদলে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, গভর্নিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; বিষয়টি নিয়ে কেবল আলোচনা হয়েছে। তবে সভার ভেতরের তথ্য বাইরে প্রকাশ হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে একে কোনো গোপন চক্রের কাজ বলে দাবি করেন।

শিক্ষকরা অবশ্য তার এই মন্তব্য মেনে নেননি। শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, আগামী ২৫ আগস্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে শেষ না করা হলে এবং নিয়োগ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব ফিরিয়ে না নেওয়া হলে তারা কঠোর আন্দোলনে নামবেন।

শিক্ষা অধিকার সংসদও এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, অযোগ্য ও অপ্রস্তুত ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব দিলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে মেধার মূল্যায়ন হবে না এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আর কোনো আস্থা থাকবে না।