বড় কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর ও লজিস্টিকস কোম্পানি দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ডের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) কাছে টার্মিনালটির কর্তৃত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষে কাজ করছে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সবচেয়ে আধুনিক এই টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত। এনসিটির মূল অবকাঠামোতে ব্যয় হয়েছে ৭৩৭ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালের ব্যাকআপ সুবিধা ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম কেনায় আরো বিপুল অর্থ ব্যয় করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটিতে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২৭১২ কোটি টাকা।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম জানান, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন টার্মিনাল এনসিটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের যন্ত্রপাতিই বর্তমানে রয়েছে। শুধু সফটওয়্যার ও আইটি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া ছাড়া এখানে নতুন কোনো বিনিয়োগের জায়গা নেই।
তবে এই টার্মিনালটির ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে কাজ করছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ। তারা তাদের ওয়েবসাইটে দাবি করেছে, এই টার্মিনালে আরো ২০৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিনিয়োগের নির্দিষ্ট খাত বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই সেখানে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেনের বিরুদ্ধে দুই হাজার কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ ওঠে দুবাইয়ে। আরব আমিরাতের গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি তদন্তও শুরু করে। মেয়ের জামাইয়ের মানিলন্ডারিংয়ের তদন্তে হাসিনার নাম চলে আসার শঙ্কা থেকেই সে দেশের সরকারকে ম্যানেজ করতে উঠেপড়ে লাগে সরকার। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় তখন। পুরো এই প্রক্রিয়াটির তদারকি করেন সালমান এফ রহমান এবং তা এগিয়ে নেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, পিপিপি অফিসের সিইও ড. মো. মুশফিকুর রহমান মিয়া এবং আরব আমিরাতের তখনকার রাষ্ট্রদূত আবু জাফর।
২০২৩ সালের ১২ জুন পিপিপি প্ল্যাটফর্মের বৈঠকে পিপিপি অফিসের সিইও, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ছাড়াও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব মোস্তফা কামাল এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে বিষয়টি মিটিং নোটসেও সংযুক্ত করেন। সেই থেকে এনসিটির সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম জড়িয়ে যায়। আওয়ামী লীগ পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত বিএনপি সরকার এই বিদেশি কোম্পানির প্রস্তাব ফিরিয়ে না দিয়ে বরং দ্রুত এটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিষয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের সঙ্গে। তিনি জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া তার সময় থেকেই শুরু হয়। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটিকে অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। সে ক্ষেত্রে ডিপি ওয়ার্ল্ড সেবা দেওয়ার বিনিময়ে বন্দর থেকে নির্ধারিত অংকের সার্ভিস চার্জ পেত— ঠিক যেভাবে বর্তমানে চিটাগং ড্রাইডক কিংবা এর আগে সাইফ পাওয়ারটেককে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরে চুক্তির কাঠামো পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটিকে কনসেশনিয়ার হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে হিসাবটা পুরোপুরি উল্টে যাবে। অপারেটর হিসেবে যেখানে প্রতিষ্ঠানটিকে সেবার বিনিময়ে বন্দর একটি সার্ভিস চার্জ দিত, কনসেশনিয়ার হিসেবে সেখানে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ প্রথমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অ্যাকাউন্টে জমা হবে। বছর শেষে সেই আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ বন্দর পাবে।
মোহাম্মদ শাহজাহানের মতে, এতে বন্দর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ একটি টার্মিনালে শুধু কনটেইনার ওঠানো-নামানো থেকেই আয় হয় না; এর বাইরে আরো বিভিন্ন ধরনের সেবা ও কার্যক্রম থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। কনসেশন চুক্তির আওতায় এসব আয়ের বড় অংশই কনসেশনিয়ার প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অসম চুক্তির ফাঁদ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেগোসিয়েশন কমিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানান, চুক্তি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি প্রস্তাব দিয়েছে। মূলত ওই প্রস্তাবের ওপরই পর্যালোচনা চলছে। এতে দেখা গেছে, এটি কেবল বাণিজ্যিক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে বন্দরের রাজস্ব কাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এই চুক্তির ফলে বন্দরের প্রধান রাজস্ব উৎস স্টোরেজ রেন্ট-এর একটি বড় অংশ অপারেটরের কাছে চলে যাবে। বিপরীতে নজিরবিহীনভাবে পরিচালন-সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য ব্যয় বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী, টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ২০ ফুটের কনটেইনার থেকে যে গড় আয় হবে, তার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে রয়্যালটি দিতে হবে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি ২০ ফুটের কনটেইনারে গড় আয় ১০৫ ডলারের কম হলে ৪২ দশমিক ৫০ ডলার রয়্যালটি দিতে হবে। আর গড় আয় ২১০ ডলার বা তার বেশি হলে রয়্যালটি বেড়ে হবে ১৪১ দশমিক ৫০ ডলার।
এভাবেই বিভিন্ন তালিকাভিত্তিক ট্যারিফ স্ল্যাব তৈরি করে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল প্রস্তাব করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। কিন্তু একই রকমের অন্যান্য পিপিপি প্রকল্প যেমনÑ লালদিয়া ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের ক্ষেত্রে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে ফিক্সড রেভিনিউ মডেলই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত আরএফপিতেও প্রতি টিইইউ নির্দিষ্ট রেভিনিউর শর্তই রাখা হয়েছে। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবনায় নতুন করে রেভিনিউ শেয়ারিং পদ্ধতি দাবি করা হয়েছে।
চলমান আর্থিক মডেল অনুযায়ী প্রতি কনটেইনারে পরিবর্তনশীল খরচ হয় ১৬ দশমিক ৩৯ ডলার; এর সঙ্গে স্থায়ী প্রশাসনিক ও পরিচালনা খরচ হচ্ছে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার। এই স্থায়ী প্রশাসনিক ও পরিচালনা খরচ অপরিবর্তনীয় এবং তা বহন করতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরকেই।
মূল্যায়ন কমিটি বলছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে বন্দরের হাতে থাকবে লাভের নামমাত্র অংশ। বন্দরের রেভিনিউ ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি টিইইউ কনটেইনারে গ্রস আয় হয় গড়ে ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ আয়ই আসে কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকার (স্টোর রেন্ট) মাশুল থেকে, যার পরিমাণ প্রতি টিইইউতে ৪০ ডলার পর্যন্তও হয়। ফলে বন্দরের প্রতি টিইইউ (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনারে মোট আয় বর্তমান ১৬১ দশমিক ৮২ থেকে কমে ১২০ ডলারের আশপাশে চলে আসবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ ফুটের প্রতি কনটেইনারে গ্রস রেভিনিউ ১২০ ডলার হলে বন্দর পাবে ৫৮ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। এই টাকার মধ্যেই বন্দরকে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে। এই টাকা বাদ দিলে বন্দরের হাতে থাকবে মাত্র ১৭ দশমিক ১৮ ডলার নিট মার্জিন। বর্তমান আর্থিক মডেলে ১২০ ডলার আয় হলে পরিচালনা ও পরিবর্তনশীল আয় বাদ দিয়েও বন্দরের মার্জিন থাকছে ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার।
দেশীয় ব্যবস্থাপনায়ও সবচেয়ে লাভজনক
চট্টগ্রাম বন্দরে মোট চারটি টার্মিনাল আছে। এগুলো হলো জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। সবচেয়ে বড় টার্মিনাল জিসিবি। এটিতে জেটি আছে ছয়টি, এনসিটিতে চারটি, সিসিটিতে দুটি ও পিসিটিতে তিনটি। আকারে ২য় অবস্থান হলেও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অপারেশনের দিক থেকে এগিয়ে আছে এনসিটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয়টি জেটি নিয়ে জিসিবি ৪৬৫টি জাহাজ পরিচালনা করেছে। বিপরীতে চার জেটির এনসিটি পরিচালনা করেছে ৭৮১টি জাহাজ। এক বছরে সিসিটিতে ভিড়েছে ২৩৮টি আর পিসিটিতে ১২২টি জাহাজ নোঙর করেছে। জিসিবির ছয়টি জেটি আলাদা ছয়টি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। সাইফ পাওয়ারটেকের সহায়তায় এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। সিসিটি সাইফ পাওয়ারটেক ও পিসিটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে। গেল অর্থবছরে এককভাবে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে শীর্ষে অবস্থান করছে এনসিটি। শুধু গেল অর্থবছরই নয়, ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি অর্থবছরেই এককভাবে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে টার্মিনালটি। খাতা-কলমে টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউ হলেও টার্মিনালটি সব সময়ই সক্ষমতার বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে।
বিদেশিদের প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আওয়ামী মাফিয়ারা
শুধু এনসিটি নয়, কয়েক ভাগে ভাগ করে পুরো বন্দরকেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আবার রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তারা বিদেশি অপারেটরদের লোকাল এজেন্ট হয়ে টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা আঁটে।
এই পরিকল্পনার প্রথম শিকার হয় পিসিটি। চট্টগ্রাম বন্দরের টাকায় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করার পর পিসিটিকে তুলে দেওয়া হয় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ের হাতে। রেড সির লোকাল এজেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাত ভাই শেখ হাফিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএইচআর শিপিং।
পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগের ব্যবসায়িক অংশীদার আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি। নির্মাণাধীন লালদিয়ারচর কনটেইনার টার্মিনালের বাংলাদেশি অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসের মালিক হাসিনার নিকটাত্মীয় ও আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল কাইয়ুম খান। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও বন্দরের টার্মিনালগুলো যাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এমন পরিকল্পনায় সাজিয়েছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। সেই প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্যে সন্দেহ
অভিযোগ উঠেছে, এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান। বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে একেক সময় একেক বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, এনসিটির অপারেশনে নিয়োজিত বেশিরভাগ যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রাংশ সচল আছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এই সক্ষমতা ৫০ শতাংশে নেমে আসবে। এই সংকট কাটাতে নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে ৩-৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন এবং সময় লাগবে ৩-৪ বছর।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, এনসিটির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ভারী যন্ত্রপাতি তার সময়ে মাত্র ৩-৪ বছর আগে কেনা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে টার্মিনালটিতে চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি) এবং চারটি রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরটিজি) যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কিউসিজি এবং ৩৩টি আরটিজি ক্রেনসহ আধুনিক সব সরঞ্জাম নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়েছে। এমনকি বন্দরে বর্তমানে অত্যাধুনিক ‘টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম’ (টিওএস) সফলভাবে সচল রয়েছে। নতুন কেনা এসব যন্ত্রাংশের বেশিরভাগের লাইফটাইম এখনো ২০ বছরের বেশি সময় আছে। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করলে আরো ১৫-২০ বছর পর্যন্ত চালানো সম্ভব। নতুন করে ৩-৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের যে গল্প শোনানো হচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। তিনি দাবি করেন, এনসিটির মতো ‘গ্রে টার্মিনাল’ ইজারা দেওয়ার নজির বিশ্বে খুব একটা নেই।
যা বলছে পিপিপি অথরিটি
বিনিয়োগের কোনো জায়গা না থাকার পরও কেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এই টার্মিনাল দেওয়া হচ্ছে জানতে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে। চৌধুরী আশিক মাহমুদ একই সঙ্গে পিপিপি কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও মহেশখালী অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান। তাকে লিখিত প্রশ্ন করা হয়, বিনিয়োগের সুযোগ যেখানে নেই, সেখানে কীভাবে ২০৫ মিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ করা হবে। আমার দেশ-এর প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘আন্তর্জাতিক বন্দর কার্যদক্ষতা সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬০-এর ঘরে থাকায় রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে অধিক সক্ষম ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটর দিয়ে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করার উদ্যোগ স্বাভাবিক বিষয়। তবে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো আলোচনা ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ, আর্থিক কাঠামো বা অপারেটর নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত জানাবে।’
কথা বলেননি স্থানীয় এজেন্ট
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে ফারহান লজিস্টিক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির এমডি আব্দুল হান্নান জানান, তারা সবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাই এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না।