Image description

দুদিন আগে প্রকাশ করা হলো এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল। বরাবরের মতো এবারও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা শুধু পাসের হারেই নয়, এগিয়ে রয়েছে ভালো ফলেও। অথচ এই মেয়েদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে না। পরীক্ষার পরের ছুটিতেই হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে অনেকের। এসএসসি থেকে এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যেও অনেক মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাবে পরিবার অথবা নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাবে তাদের পড়াশোনা।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার জাহিদা আক্তার (১৯)। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন শিক্ষক হওয়ার। পড়াশোনা ভালোই চলছিল। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের খরচ কমাতে একাদশ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে দেওয়া হলো জাহিদার। শ্বশুরবাড়ির লোকজন পড়াশোনা চালিয়ে নেবেন কথা দিলেও এক বছর যেতে না যেতেই হলেন সন্তানের মা। এখন সংসার-সন্তান সামলাতেই বেলা যায়, পড়াশোনার সময়  কোথায়! বাল্যবিয়ে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা, নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ— সব মিলিয়ে ১৫-২৪ বছর বয়সী মেয়েরা আটকে যাচ্ছে নানা সংকটে। এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেশি এ বয়সী মেয়েদের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশে এ বয়সী তরুণীর সংখ্যা ১ কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৮। অর্থাৎ এই বিপুলসংখ্যক তরুণী দিন কাটাচ্ছে নানা সংকট মাথায় নিয়ে, পিছিয়ে পড়ছে একই বয়সী তরুণদের তুলনায়।

কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হকের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তরুণীরা পিছিয়েই থাকবে। পরিবার মেয়েদের পড়াশোনায় কম খরচ করতে চায়, বিয়ে দিয়ে নিরাপদ বোধ করে। আবার ঘরের বউদের চাকরি করার দরকার নেই বলে মনে করেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। পাশাপাশি সামাজিকভাবে হেনস্তা, নির্যাতন-নীপিড়ন তো আছেই। এসব কারণে তরুণীদের ভালো থাকার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৫-২৪ বছর বয়সীদের যুব বলা হয়। যদিও বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতিতে ১৮-৩৫ বছর বয়সীদের যুব ধরা হয়। তবে এ প্রতিবেদনে যুব হিসেবে ১৫-২৪ বছরের তরুণীদেরই আমলে নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা থেকে বেশি ঝরে মেয়েরা: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলে বরাবরই মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। তবুও শিক্ষা থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেশি। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ৩০ দশমিক ৬৩ হলেও মেয়েদের হার ৩৪ দশমিক ৮৭। একই বছরে উচ্চমাধ্যমিকে ২২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়েছে, যা ছেলেদের তুলনায় বেশি।

২০২৪ সালে ইউনিসেফের এক জরিপে স্কুল থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার কারণগুলো উঠে এসেছিল। সেখানে দেখা যায়, ৫২  দশমিক ৩১ শতাংশ মেয়ে পড়াশোনা ছেড়েছে বিয়ের কারণে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণে ছাড়তে হয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশকে, ৮ দশমিক ১ শতাংশ ছেড়েছে অভিভাবকের অনীহায়, ৬ দশমিক ২ শতাংশ গৃহস্থালির কাজে যুক্ত হওয়ার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি এবং শুধু ৫ দশমিক ২ শতাংশ পড়াশোনায় আগ্রহ না থাকার কারণে স্কুল ছেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান বলছিলেন, ‘মূলত সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও ধর্মীয় কারণে মেয়েরা উচ্চশিক্ষার আগেই ঝরে যায়। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অভিভাবকদের বোঝাতে হবে, পারিবারিক আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মেয়েদের পড়াতে হবে। পড়াশোনায় মেয়েদের ধরে রাখতে প্রণোদনা আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কারও খরচ চালাতে অসুবিধা হলে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্যও উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’

বাল্যবিয়ের চাপ: তরুণীদের পিছিয়ে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ বাল্যবিয়ে। সরকারের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ বলছে, দেশে ২০-২৪ বছর বয়সী প্রায় প্রতি দুই নারীর একজন (৪৭ দশমিক ২%) ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়েছেন। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, আর বিশ্বে অবস্থান অষ্টম। এই জরিপের তথ্য আরও বলছে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন নারীদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬৯, আর উচ্চমাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষা পাওয়া নারীদের মধ্যে ২৮ শতাংশ। দরিদ্রতম পরিবারের ক্ষেত্রে ৬৫, ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে ৪১ শতাংশ।

নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষের সদস্য শিরীন হক বললেন, ‘মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে সমাজে এখনো তা অপরাধ নয়; বরং কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। মা-বাবা বিয়ে দিয়ে তাই দায়মুক্ত থাকতে চান। এ মানসিকতা দূর করতে ও কম বয়সে বিয়ের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার।’

অনেক সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিয়ে বন্ধ হয়, শিক্ষকরা সাহায্য করেন উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড কমিশনারদের জবাবদিহির মধ্যে আনা গেলে এমন বিয়ের সংখ্যা কমবে। জন্মসনদের ব্যবহার সর্বজনীন করা গেলেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।’

কাজের বাজারেও পিছিয়ে তরুণীরা: বিবিএসের জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ বলছে, ১৫-২৪ বছর বয়সী মোট জনসংখ্যার ৩৪ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়। অর্থাৎ এ বয়সী ১ কোটি ৮ লাখ ১১ হাজার ৪০৪ যুব অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। ছেলেদের মধ্যে এই হার ১৩ দশমিক ২৮। একই বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ৫২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ ১৫-২৪ বছর বয়সী প্রতি ১০০ তরুণীর মধ্যে ৫৩ জন শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে, যা ছেলেদের তুলনায় চার গুণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কাজের সুযোগ পেলেও অনেক তরুণী এমন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা কম। কর্মবান্ধব পরিবেশ ও ডে-কেয়ারের অভাবেও অনেক নারীকে চাকরি ছাড়তে হয়। তাদেরই একজন বেসরকারি চাকরিজীবী তৃণা পাল। শুধু কর্মস্থলে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না বলে কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলছিলেন, ‘দেশের জনমিতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে তরুণীদের বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়। এতে শুধু একজন তরুণীর ভবিষ্যৎ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।’ এ সংকট মোকাবিলায় মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি, নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিতের ওপর জোর দিলেন তিনি।

মানসিক চাপও বড় উদ্বেগ: দেশে তরুণীদের নিরাপত্তা একটি বড় সংকট। রাস্তায় চলাচল, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে অনলাইন জগৎ— সবখানেই তারা নানা ধরনের হয়রানি ও ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি তরুণীরা এসব কারণেও উদ্বেগে থাকেন। নানা ধরনের মানসিক চাপ বাড়ায় অনেকেই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।

আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের স্কুলপর্যায়ে আত্মহত্যা করেছে ১৯০ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ বা ১৩৯ জন। আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে একই বছরে আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ৪০৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জনই নারী (৬১ দশমিক ৮%)। এ ছাড়া, বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রবণতা বেশি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ নারী মানসিক রোগে আক্রান্ত পাওয়া গেছে, পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলছেন, কম বয়সে মানসিক চাপের সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তা সামাল দিতে পারে না, তখন আত্মহত্যায় সমাধান খোঁজে অনেক তরুণী। বেশিরভাগ সময় এটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হয়। মেয়েদের আবেগ বেশি থাকায় এবং বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের দুঃখবোধ বেশি থাকে, আত্মহত্যা বেশি করে— যোগ করলেন তিনি।