সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১৬ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস।
নিহতদের মধ্যে ১১ জনের বাড়ি উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় বলে তথ্য পাওয়া গেছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান।
তবে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয় বলছে, নিহতদের মধ্যে আত্রাইয়ের ১৩ জন রয়েছেন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, রিয়াদের শিফা থানা এলাকার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় ওই সোফা তৈরির কারখানাটি বাংলাদেশী কর্মীরাই পরিচালনা করে আসছিলেন।
রোববার স্থানীয় সময় বেলা দুইটার দিকে আগুন লাগে এবং এর পরপরই সেখানকার ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
ছবির উৎস,https://probashi.gov.bd/
চুল কাটতে গিয়ে বেঁচে গেছেন হাবিবুর
বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইং জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থল থেকে মোট ১৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে এবং সৌদি আরবের স্থানীয় সময় রাত ১১টায় উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে।
জানা গেছে, ওই কারখানায় মোট ১৭ জন বাংলাদেশী কর্মী কাজ করতেন।
এর মধ্যে হাবিবুর রহমান হাবিব নামে একজন মাত্র ব্যক্তি ঘটনার সময় বাইরে থাকায় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছেন।
মি. রহমানকে উদ্ধৃত করে দূতাবাসের লেবার উইং প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, "একজন জীবিত কর্মী হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন দুপুর দেড়টার দিকে তিনি চুল কাটার জন্য সেলুনে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন কারখানায় আগুন জ্বলছে। ফলে ১৭ জন কর্মীর মধ্যে বাকী ১৬ জনই মারা গেছেন," ।
মি. রহমান পরে বিবিসি বাংলাকেও একই কথা বলেছেন।
তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই ওই কারখানাটির মালিক ও শ্রমিক ছিলেন, অর্থাৎ আসবাব বানিয়ে নিজেরাই বিক্রি করতেন।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সূত্র দূতাবাসকে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। বাকীরা কালো ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান।
যে ১৬ জন মারা গেছেন তারা হলেন - ফরিদ, শুভ, মোঃ রুবেল প্রামাণিক, সুমন, মোঃ কলিম উদ্দিন, মোঃ মোহন, মোঃ সুমন, মিনহাজ, হৃদয়, শাহিন, আব্দুল জলিল, মজিদুল, সাগর, শামিম, সাব্বির ও শ্যামল।
এর মধ্যে সাব্বির ও শামিম নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার, আর শ্যামল রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।
ছবির উৎস,https://probashi.gov.bd/
এদিকে, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর এবং রাজশাহীর ১৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
এক শোক বার্তায় মন্ত্রী জানান, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থল ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও ওই বার্তায় জানিয়েছেন তিনি।
ওদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরদেহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফেসবুক পাতায় বলা হয়েছে, "ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে"।
নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তায় দূতাবাস প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
ফেসবুকে এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিকভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সে অনুযায়ী সহায়তার কথা জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার সৌদি আরব।
বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ গিয়েছেন। যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষই সৌদি আরবে গেছেন।