Image description

ভারতের দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে ঢাক-দিল্লির সম্পর্ক। এ আয়োজনের কয়েকদিন আগেই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দিল্লিতে যেন সংবাদ সম্মেলনটি না হয়, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে, জানানো হয়েছিল সেই আশঙ্কার কথা। তারপরও ঢাকার অনুরোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের দায় দিল্লিকেই নিতে হবে বলেছেন সরকারের উচ্চমহল, কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দুই দফায় এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো দায় নেই বললেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এর সম্পূর্ণ দায় দিল্লিকেই নিতে হবে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রথা না মেনে এমনটা করা হয়েছে। উসকানিমূলক এমন আচরণ বন্ধ না হলে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দীর্ঘ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বলেন, দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যে বক্তব্য এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন, এর দায় ভারত এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে একজন সাবেক স্বৈরশাসক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ভারতে বসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের আপত্তি রয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকা একজন রাজনৈতিক নেতাকে ভারত কীভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নেতা হিসাবে বিবেচনা করতে পারে। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিরুদ্ধে এবং দেশে অস্থিরতা তৈরির মতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার দায়িত্ব ভারত এড়িয়ে যেতে পারে না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। শেখ হাসিনাকে ভারতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক-দুটো বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।

একই আয়োজনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তোলেন, তারেক রহমানের চীন সফরের কারণেই ভারত ‘হাসিনা কার্ড’ খেলছে কি না। তিনি বলেন, ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া কীভাবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন সম্ভব, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার।

বুধবার সন্ধ্যায় ভারতের নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) অব সাউথ এশিয়ার নির্ধারিত এক প্রেস কনফারেন্সে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এই আয়োজনের কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা যেন ভারত থেকে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দেন, সে বিষয়ে দেশটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও বিষয়টি তোলা হয়। একই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে ভারতকে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। একদিন পর মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত এক ব্রিফিংয়ে জানান, শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। তাই এর দায়ও তারা নেবে না।

জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রশ্রয়, তার ইচ্ছামতো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনীতি করতে দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা ভারত সরকারের, যা এক ধরনের উসকানিমূলক আচরণ। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি দীর্ঘ সময়েও ফিরে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। ভারত যদি দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি চায়, তাহলে এ ধরনের উসকানিমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা এখন যা করছে, তা কূটনৈতিক রীতিনীতি ও শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ বিরোধী।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের মেহমান। ভারত তাকে সেভাবেই দেখে। মেহমান বেড়াতে এসে যদি এমন কাজ করে, যাতে অন্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক খারাপ হয়, তাতে আপনার দায় নেই-এমনটা বলা যাবে না। দায় ভারতের অবশ্যই আছে এবং সে বিষয়ে তাদের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। সরকারের সম্পৃক্ততা নেই-এমন কথা ভারতের দিক থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো টেকনিক্যাল ইস্যু নয় রাজনৈতিক ইস্যু।

সাবেক এই কূটনীতিক আরও বলেন, এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। কারণ, বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষ, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে হিট করছে। কাজেই এতগুলো জায়গাকে নেতিবাচকভাবে ঠেলে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গেলে পলিসি লেভেলেও রেজিসট্যান্স ফেস করতে হয়। সরকারের জন্য জটিলতা তৈরি হয়। তাই এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা দরকার। তা না হলে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা আছে।

পুরো বিষয়টিতে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের বিশ্লেষণে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ যুগান্তরকে বলেন, ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। এমন একটি দিনে ভারতের দিল্লিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স করা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার দায় ভারত সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এর সম্পূর্ণ দায় তাদের। ভারত সরকার তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের মাধ্যমে জানিয়েছে, এই প্রেস কনফারেন্সে সরকারের দিক থেকে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। অনুষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট আয়োজন। কিন্তু ভারত সরকার চাইলেই এটি বন্ধ করতে পারত, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সাধারণত কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব কথা বলেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সংবাদ সম্মেলনটি যেন করার অনুমতি না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে সেটি দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কথা বলার পর বিষয়টির গুরুত্ব ভারত সরকারের অনুধাবন করা উচিত ছিল। তারা সেটি করেনি, অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেটি ‘পারফেক্ট রেসপন্স’। অনেকে বলেছেন, চিঠির ভাষা কঠোর হয়ে গেছে, কূটনীতির ভাষা হয়নি। কিন্তু যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কি কূটনৈতিক শিষ্টাচার বা প্রথা মেনে হয়েছে? কূটনৈতিক শিষ্টাচার বা প্রথার মধ্যে পড়ে না এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে-এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের উত্তর ছিল একেবারে যথাযথ।

তবে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির পর সরকারের আর কথা বলার প্রয়োজন ছিল না বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার হিসাবে বিএনপি কিছু অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছে। সেদিক থেকে ভারতের বিষয়ে কিছু বলতে গেলে সরকার কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু এ ঘটনার ক্ষেত্রে ভালো হতো যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির পর সরকার বিষয়টি এড়িয়ে যেত। বেশি বলা হলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে যায়।