নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মেঘনা নদীর কোলঘেঁষা ঘাটপাড় এলাকা। সেখানেই ছিল নুরু ডেইরি ফার্ম। তিনবার হাতবদলের পর এখন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। মালিক নুরুজ্জামান বর্তমানে দুবাইপ্রবাসী। এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোক্তা তহবিল থেকে নেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি টাকা। বিপরীতে বন্ধক রাখা হয় ৮ বিঘা ১১ শতাংশ জমি। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, ওই জমির পুরোটাই মেঘনা নদীর পানি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া দলিল দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক গভর্নর ফজলে কবির এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের প্রভাব খাটিয়ে ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ডের (ইইএফ) ওই অর্থ ছাড় করানো হয়। এক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপরও। ওই একই জমি বন্ধক রেখে শুধু মালিকের নাম বদলে দুই দফায় আরও ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে ওই অর্থ আদায়ে এখন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না আইসিবি।
উদ্যোক্তা তৈরির তহবিল, আদায় হয়নি বেশিরভাগ অর্থ
দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড বা ইইএফ। উদ্দেশ্য ছিল, উদ্যমী তরুণ ও উদ্যোক্তাদের ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়তা করা। বিশেষ এ তহবিল থেকে উৎপাদনমুখী প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তা তৈরির তহবিল থেকে ২০০১-১৮ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮টি প্রকল্পে বিতরণ করা হয় প্রায় ১ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। এরপর ২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী আট বছরে আগের ফান্ডের নাম বদল করে রাখা ইএসএফ থেকে বিতরণ করা হয় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। তথ্য বলছে, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫ বছর পার হলেও অনাদায়ী রয়েছে ১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ উদ্যোক্তা তৈরির যে স্বপ্ন নিয়ে তহবিলটি করা হয়েছিল, তার বড় একটি অংশের অর্থই এখনো ফেরত আসেনি।
ইইএফের বেশ কিছু প্রকল্প সফল হয়েছে। হাতেগোনা অল্পসংখ্যক প্রকল্প উৎপাদনে গেছে। কেউ অর্থ ফেরত দিয়ে প্রকল্পের মালিকানাও পেয়েছেন। তবে বিপরীত চিত্রই বেশি। অনুসন্ধানে এমন প্রকল্পের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে ভুয়া দলিল, অন্যের জমি, খাসজমি, নদী কিংবা ওয়াকফ সম্পত্তি জামানত দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বললেন, ‘তহবিল ব্যবস্থাপনায় শুরু থেকেই ঘাটতি ছিল স্বচ্ছতার। ছিল রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও তদারকির অভাব।’ তার মতে, ‘সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থছাড় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত এই তহবিলে মনিটরিং ও তদারকি দুর্বল ছিল।’ জনগণের সম্পদ এভাবে অপচয় হওয়া উদ্বেগের বড় কারণ বলেও মন্তব্য করলেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘তহবিলের অনিয়মে যারা জড়িত, তাদের পরিচয় যাই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা উচিত তাদের।’
তিন দফায় ৫ কোটি, ঘুষ দিতে হয়েছে ২১ বার: রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকার ব্যবসায়ী মুকুল আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠান সোনানি ট্রেডার্স লিমিটেড। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঢাকার অদূরে ধানি জমি বন্ধক রেখে ইইএফের সহায়তা নেন তিনি। তহবিল থেকে ৫ কোটি টাকা তিন দফায় ছাড় করা হয়। মুকুল আহমেদের অভিযোগ, অর্থ ছাড়াতে তাকে ৯ ব্যক্তিকে ২১ বার ঘুষ দিতে হয়েছে। এতে তার ৯২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয় বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রভাবশালী ডেপুটি গভর্নরের প্রভাবে ২০২১ সাল পর্যন্ত ওই অর্থের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হয়নি। এরপর করোনার ধাক্কায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যান্য ব্যাংকের ঋণের কিস্তির চাপও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। অর্থ আদায় না হওয়ায় আইসিবি করে মামলা। মামলার ভয়ে উদ্যোক্তা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বন্ধকি জমি থেকেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে আইসিবি।
ভুয়া নথিতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা: টঙ্গীর পরাগ এলাকার ২৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের গ্রিন ভিলেজ ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি কথিত নেটওয়ার্ক কারখানার অস্তিত্ব। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রফিকুল ইসলাম। তহবিল থেকে অর্থ নেওয়ার সময় তিনি ভুয়া নথিপত্র দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাকে এখন শনাক্ত করতেও হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় নুরুল ইসলাম নামে একজন জানালেন, রফিকুল ইসলামকে তিনি চেনেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এস কে সুরের সহায়তায় রফিকুল তহবিলের অর্থ পান। ২০২১ সালে করোনাকালে এলাকায় এলে রফিকুল নিজের মুখে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করলেন নুরুল ইসলাম।
জানা গেছে, রফিকুল দুই দফায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা নিয়েছিলেন। পরে আইসিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধের পর তিনি গা-ঢাকা দেন।
খাসজমি ও অন্যের খামার দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলা সদরের বাসিন্দা মনির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধেও রয়েছে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সরকারি খাসজমি এবং অন্যের গরুর খামারের সামনে ভুয়া সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিজের প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়। খামারের মালিকের কাছ থেকে কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি বলে রয়েছে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, আইসিবির একটি সংঘবদ্ধ চক্র এতে সহযোগিতা করেছে। প্রকল্প সরেজমিনে না দেখেই ভুয়া টিএডিএ নিয়েছে ওই চক্রটি। অার ৫ কোটি টাকার অর্থ ছাড়ের বিপরীতে দফায় দফায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনির হোসেন সোহাগ।
সিএজির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে অনিয়মের চিত্র: এই তহবিলের অর্থ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) প্রতিবেদনেও। ২০১৯-২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ নেওয়া অনেক উদ্যোক্তাকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ ইচ্ছা করেই যোগাযোগ করছেন না। অনেক প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের কোনো তথ্যও নেই। বারবার নোটিস দেওয়ার পরও সাড়া দেননি অনেক উদ্যোক্তা।
সিএজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ বাস্তবায়ন না করেই গ্রাহকের অনুকূলে অর্থছাড় করা হয়েছে। কোম্পানির নামে জমি রেজিস্ট্রেশন এবং ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের ঘটনাও পাওয়া গেছে। অনেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি আমদানি করা যন্ত্রপাতির প্রকৃত দাম এবং মানও নিরূপণ করা হয়নি। জমির প্রকৃত মালিকানা ও মান যাচাই না করে ভুয়া নথির বিপরীতে অর্থ দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছে সিএজি।
ইইএফ থেকে ইএসএফ: ২০০১ সাল থেকে উদ্যোক্তাদের প্রকল্পে ইক্যুইটি (নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন) হিসেবে অর্থ দেওয়া হতো। তহবিল থেকে সহায়তা পাওয়া উদ্যোক্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৪৯ শতাংশ শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতেন। বাকি ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকত উদ্যোক্তার নিজের। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করার পর প্রকল্পের পূর্ণ মালিকানা পাওয়ার সুযোগ ছিল উদ্যোক্তাদের। তবে অর্থ আদায়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইক্যুইটি শেয়ার ঋণ না হওয়ায় আইনি পদক্ষেপ নিয়ে অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও ছিল জটিলতা।
২০১৮ সালে ইইএফের নাম পরিবর্তন করে করা হয় ইক্যুইটি সাপোর্ট ফান্ড বা ইএসএফ। ইএসএফের আওতায় ইক্যুইটির পরিবর্তে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয় চার বছর। এরপর ছয় মাস পরপর কিস্তিতে আট বছরে ঋণ পরিশোধের বিধান করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে আট বছরে ইএসএফ থেকে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা।
আইসিবির হাতে তহবিল, পরিচালনা নিয়ে টানাপড়েন: আইসিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ২০০৯ সাল থেকে আইসিবি পুরো তহবিল দেখভাল করছে। নীতিমালা ও তহবিলের অর্থের জোগান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে আইসিবির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও একটি বিশেষ মহল এর অপারেশনাল ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ২৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল পরিচালনা করতে চায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইইএফ ও ইএসএফ মিলিয়ে তহবিল থেকে বিপুল অর্থ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু আইনি ফাঁকফোকর এবং মামলার সুযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়েও অর্থ পরিশোধ করেননি। পরে আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়। মামলা করার সুযোগ তৈরি করা হয়। তবে কুমির চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন ও পালনসহ কিছু প্রকল্প সরকারি নীতিমালার ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। একইভাবে গ্রিনহাউজে মাংস উৎপাদনের মতো নতুন ধরনের প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইসিবির বক্তব্য, আদায়ে চেষ্টা চলছে: ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বললেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। কোনো ঋণ নিয়ে সমস্যা হলে তা বোর্ডে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।’ তবে আগের কিছু গুরুতর সমস্যার কারণে আদায় ক্ষীণ হয়েছে বলে জানালেন তিনি। এরপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন আইসিবির চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য: বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বললেন, ‘দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলোর বিনিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে কিছু প্রকল্প সফল হয়েছে। এসব প্রকল্পের উদ্যোক্তারা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।’
তার মতে, ‘অর্থ নয়ছয় হলেও এখন আদায় বেড়েছে। তবে মূল সংকট হলো, অনেকে ভুয়া নাম ও ভুয়া জামানত ব্যবহার করে অর্থছাড় করেছেন।’