‘জালেমরা আমাকে বাবার জানাজার নামাজেও দাঁড়াতে দেয়নি।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফেনীর পরশুরামের বাসিন্দা মো. সাদ্দাম হোসাইন। নিজেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী দাবি করা এই যুবকের অভিযোগ, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ এবং নির্যাতনের পর আজও তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। চাঁদাবাজি, ব্যবসা দখল, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।
সাদ্দামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৭ বছর ধরে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তৎকালীন সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়, যার বেশির ভাগই তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেন। এসব মামলায় তাকে চারবার কারাবরণ করতে হয়।
তার দাবি, ২০১৩ সালে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে আটক অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। সেই ঘটনার মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে তার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল, ছেলে যেন তার জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পাননি।
কালবেলাকে সাদ্দাম বলেন, ‘জালেমরা আমাকে বাবার জানাজার নামাজেও দাঁড়াতে দেয়নি।’
তিনি বলেন, বাবাকে হারানোর সেই বেদনা তাকে আরও বেশি আন্দোলনমুখী করে তোলে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনে অংশ নেন। তার দাবি, দেশের জন্য আন্দোলন করলেও তিনি কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেননি।
তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার জীবনে নতুন সংকট নেমে আসে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
- ব্যবসা দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
সাদ্দামের অভিযোগ, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র তার ব্যবসা দখলের চেষ্টা শুরু করে।
স্বজনদের সহযোগিতায় ফেনী শহরের পোস্ট অফিস রোডে ‘হোটেল পানশি’ ও ‘উৎসব কাবাব’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট চালু করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই চাঁদাবাজি, হুমকি ও দখলচেষ্টার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করেন।
তার দাবি, গত বছরের ২৩ অক্টোবর এক সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদারের সহযোগিতায় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জোরপূর্বক দুটি ব্যাংক চেকে সাত লাখ টাকা লিখে নেয়। পাশাপাশি ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পেও তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ফেনী সদর ও ফুলগাজী উপজেলার কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন তিনি।
- অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ
সাদ্দামের ভাষ্য, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রোজা অবস্থায় তার রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে অপহরণ করা হয়।
তার অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টা ধরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করে জোরপূর্বক নাচতে বাধ্য করা হয় এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে উদ্ধার হলেও মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।
- চাঁদা দাবির অভিযোগ
সাদ্দামের অভিযোগ, সুলতান মাহমুদ হকার্স মার্কেটের এক ব্যবসায়ী তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি এবং আমার দুই অংশীদার বহুবার অনুরোধ করেও আজ পর্যন্ত দোকানের চাবি ফেরত পাইনি।’
এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেন। পরে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তর করেন।
বর্তমানে তার দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন সাদ্দাম। এতে প্রায় ২১ লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন। এছাড়া মামলা তুলে নিতে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় তিনি ফেনী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।
সাদ্দাম বলেন, ‘যে দেশের জন্য এত কিছু ত্যাগ করলাম, সেই দেশ কি আমাকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারবে না?’
তিনি জানান, তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তিনি সপরিবারে প্রশাসনিক কার্যালয়ের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করবেন।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।