দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে এক হাজার ৭৭৫ হত্যাকাণ্ড এবং ১০ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময় প্রায় প্রত্যেক মাসেই অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর সঙ্গে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ধারাবাহিক ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে জানুয়ারিতে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল এক হাজার ২৮১টি। জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ১৯৪টিতে। একইভাবে জানুয়ারিতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৮৭টি, যা জুনে বেড়ে ৩২৩টিতে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারিতে অপরাধের সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও পরের মাসগুলোয় প্রায় সব ধরনের অপরাধই ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। দিনদুপুরে সড়ক, গণপরিবহন কিংবা বাড়ি ফেরার পথে হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের একাধিক ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
একদিনেই একাধিক অপরাধ
গত ২ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এছাড়া আরো দুটি লাশ উদ্ধার এবং একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কক্সবাজারের টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে দিনদুপুরে ডাকাতির ঘটনায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ ওঠে। টেকনাফ স্থলবন্দর-সংলগ্ন ১৪ নম্বর সেতুর কাছে গাছ ফেলে কয়েকটি যানবাহনের গতিরোধ করে ডাকাতরা হামলা চালায়। এ সময় তাদের ছোড়া গুলিতে এক যাত্রী আহত হন। ঘটনার পর পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সদস্যরা অভিযান শুরু করেন।
রাজধানীর কলাবাগানের কাঁঠালবাগানে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী ও শাশুড়িকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে শিপন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর তিনি নিজেই থানায় আত্মসমর্পণ করেন। নিহতরা হলেন শিপনের স্ত্রী রাত্রি (২০) ও তার শাশুড়ি ফিরোজা বেগম (৩৫)। অন্যদিকে নরসিংদীর রায়পুরায় পূর্ববিরোধের জেরে মোমেন মিয়া (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আরো তিনজন আহত হন।
ঊর্ধ্বমুখী অপরাধের গ্রাফ
সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের পরও থামছে না অপরাধের মাত্রা। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হত্যা করা হয় ২৮৭ জনকে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০ এবং জুনে সর্বোচ্চ ৩২৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
কেবল খুন নয়, অন্যান্য অপরাধের গ্রাফও ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে মোট ১৪ হাজার ৫৮টি মামলা রেকর্ড হয়, যার মধ্যে ৫২টি ডাকাতি, ১৬৩টি দস্যুতা এবং এক হাজার ২৮১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। ফেব্রুয়ারিতে মামলার সংখ্যা ১১ হাজার ৭৭৫টি, যার মধ্যে দস্যুতা ১৩৪ এবং মাদক-সংক্রান্ত মামলা তিন হাজার ৩৫৯টি। মার্চে অপরাধের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে হয় ১৬ হাজার ১৫৭টি, যেখানে মাদক-সংক্রান্ত মামলাই ছিল পাঁচ হাজার ৬২টি। এপ্রিলে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭ হাজার ১৮০টি, যার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন ছিল দুই হাজার ১১টি। মে মাসে মোট ১৮ হাজার ১৪৯ মামলার মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলা ছিল সাত হাজার ৯২টি। আর জুনে অপরাধের সব রেকর্ড ভেঙে ১৮ হাজার ৭৪৯টি মামলা দায়ের হয়, যার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল দুই হাজার ১৯৪টি এবং মাদক মামলা ছিল ছয় হাজার ৫৮৫টি।
সারা দেশে বোমাতঙ্ক
সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দুটি পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
এর আগে মতিঝিলে আইইডি এবং আশুলিয়ায় প্রেশার কুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তাধীন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলোতে বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিটি ঘটনাই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।
আগস্ট মাসে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিলক্ষিত হওয়ায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক
আইনশৃঙ্খলার এমন চরম সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে নারী ও শিশুরা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী বছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
সম্প্রতি শিশু রামিসা ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হলেও অপরাধীদের এখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় একের পর এক ধর্ষণের খবর মিলছে। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং সামাজিক অস্থিরতাকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের বক্তব্য
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক আমার দেশকে বলেন, ৫ আগস্টের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আন্ডারওয়ার্ল্ড-সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের মুক্তির ফলে অপরাধচক্র নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তারাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, খুন ও আধিপত্য বিস্তার করে অপরাধে জড়াচ্ছে।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস উইংয়ের এআইজি (মিডিয়া) শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি বহুমাত্রিক বিষয়। এটি শুধু পুলিশের সক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অপরাধের ধরন, অপরাধচক্রের তৎপরতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এর সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তৎপরতা, বিশেষ অভিযান, টহল ও সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।