চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাস জুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রমিক নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত ছিল।
আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরএসএস তাদের জুলাই-২০২৬ মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিক, সংগঠনের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলের ঘটনায় অন্তত ৬ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষসহ ১৬৪ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক মামলার চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৪১টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৮৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৫ হাজার ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় জুলাই মাসে মোট ১৯৩টি ঘটনায় অন্তত ৯ হাজার ১৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩১৮ জন, বিএনপির ২৮ জন, এনসিপির ৭ জন এবং জামায়াতের এক নেতা-কর্মী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে জুলাই মাসে ৪৯টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৩৬টি ঘটনায় ৫৫ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি জুলাই মাসে ৯টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হন।
কারাগারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি এবং আটজন হাজতি ছিলেন। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দুই নেতা-কর্মীও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতন ও কর্মস্থলের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরে এইচআরএসএস জানায়, জুলাই মাসে ৭৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আরও ৫৫ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ২৫৮ নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৫ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৬১ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এ ছাড়া ১১ নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
যৌতুকের কারণে একজন নারী নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৫ জন নিহত, ১০ জন আহত এবং ২৩ নারী আত্মহত্যা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। জুলাই মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৮০ শিশু। তাদের মধ্যে ৩৪ জন নিহত এবং ১৪৬ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার।
প্রতিবেদনের বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বললেন, ‘জুলাই মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।’