গ্যাস সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি দূর করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিতাস, বিবিয়ানাসহ প্রধান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করুন । দুর্নীতি কমিয়ে গ্যাস উত্তোলনে অর্থ বিনিয়োগ করুন।
সোমবার রাতে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাসীনদের কাছে আশা করেছিলাম- কোটি কোটি মানুষের এই রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানের সুফল মানুষ পাবে । কিন্তু নতুন সরকারের পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও চারিদিক থেকে মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও জনদুর্ভোগ এত পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সরকারের দায়িত্বশীলরা এখন বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নের মুখে পড়ছেন এবং মানুষ ‘ভুয়া ভুয়া’ শব্দ উচ্চারণ করে জবাব চাচ্ছে ।
তিনি বলেন, আজ জনদুর্ভোগের পাশাপাশি লুটপাট, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, খুন এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি স্তরে আগের ফ্যাসিবাদী যুগের মতো দুর্নীতি ও দলীয়করণের একটা সিন্ডিকেট যেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও কম, ফলে প্রতিদিন ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে । মা-বোনেরা চুলা জ্বালাতে পারছেন না। অনেকে রাজপথে হাড়ি-কড়াই নিয়ে মিছিল করছেন ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে এই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বা উৎপাদনে সরকারের কোনো বিনিয়োগ বা পরিকল্পনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না ।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাবে রান্নাবান্নার সমস্যা ছাড়াও শিল্পখাতে উৎপাদন কমে গেছে এবং সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ ভোগান্তি দেখা দিচ্ছে । এর মধ্যে ২০২৬ সালের জুনে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে । ভুতুড়ে বিল নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবহার না করলেও দ্বিগুণ-তিনগুণ বিল আসছে । ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে দুই দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারও নাগালের বাইরে । কাঁচা মরিচের দাম ৪০০ টাকা, মোটা চাল ৫৮ টাকা, মিনিকেট ৮০ টাকা, মসুর ডাল ১৩০ টাকা এবং আলুর দাম ৭৫-৮০ টাকায় পৌঁছেছে । অথচ সরকার এখন সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত। তারা জুলাই সনদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধী দলকে দমন করার নতুন ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত, কিন্তু দ্রব্যমূল্য বা গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই । যোগ্য বিশেষজ্ঞের বদলে দলীয় লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারাতো জাতির জন্য কাজ করবে না, বিএনপির পক্ষে কাজ করবে।
জনদাবির বিষয়গুলোতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান পার্লামেন্টে সর্বদা সোচ্চার আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যারা জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্ত ভুলে ক্ষমতা দখল ও দুর্নীতির পথে হাঁটছেন, তাদের ‘না’ বলতে হবে ।
এ সময় ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি বলেন, বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে সার্ভিস চার্জ এবং ডিমান্ড চার্জ কাটা হচ্ছে, যা আসলে এক ধরণের ডিজিটাল চাঁদাবাজি। পার্লামেন্টে ওয়াদা করা সত্ত্বেও এগুলো বন্ধ করা হয়নি । বছরে ৬৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার নাম করে লুটপাটের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে ।
তিনি আরো বলেন, গ্যাসের ক্ষেত্রেও আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। এক্সপার্টরা বলছেন, আমাদের দেশে তিনটি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অথচ গত ১৭ বছরে পর্যাপ্ত খনন কাজ হয়নি । অবিলম্বে গ্যাস ও জ্বালানি কেন্দ্রিক একটি জাতীয় নীতি করে দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান ও আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।