Image description

দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন এলাকা হয়েও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে চট্টগ্রামবাসী। মাতারবাড়ী ও বাঁশখালী এসএস পাওয়ারের মতো মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।

এই উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ পাঠানো হচ্ছে পুরো দেশের জাতীয় গ্রিডে। তারপরও স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত ৩০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এই চিত্র উঠে এসেছে।

সর্বশেষ সোমবার দুপুর ১টার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ছিল ৯০০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২০০ মেগাওয়াট।

কাগজে কলমে ২০০ মেগাওয়াটের লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এর চেয়ে খারাপ। রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। টানা এক-দুইঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না জেলার কোনো এলাকায়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।’ সরবরাহ কেন কম সেটি তিনি জানেন না বলে জানান।

চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল ভিত্তি এখন দুটি বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। বাঁশখালীর এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার কেন্দ্র থেকে ১ ও ২ আগস্ট টানা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয় গ্রিডে। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়। যদিও ৩১ জুলাই সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটিতে তা কমে ৭৯০ মেগাওয়াটে নামে। এছাড়া গ্যাসভিত্তিক শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি নিয়মিত ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন বজায় রেখেছে।

বিপরীতে সরকারি পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ভিন্ন চিত্র মিলেছে। চট্টগ্রাম শহরঘেঁষা রাউজান ১ ও ২ নম্বর ইউনিট (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ছিল সিইপিজেডের ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্টও।

কক্সবাজারের বায়ু ও টেকনাফ-কাপ্তাইয়ের সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও ধারাবাহিকতা নেই। ৩০ জুলাই বেলা ১১টায় কক্সবাজার বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিললেও পরদিন একই সময়ে সেখান থেকে উৎপাদন নেমে আসে শূন্যে। কাপ্তাই, টেকনাফ ও কেইপিজেডের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। আর মেঘলা দিনেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদ্যুৎ দিতে পারছে না বলে তথ্যে উঠে এসেছে।

লোডশেডিংয়ের এই বাস্তবতায় দুর্বিষহ দিন কাটছে নগরবাসীর। চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী শারমিন লিপি বললেন, ‘সকালে খাবার তৈরি করতে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি গ্যাস নেই। ভাবলাম কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ নেই। এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি।’

হালিশহরের বাসিন্দা সুরাইয়া জান্নাত বলেছেন, ‘রবিবার রাত একটা ৩৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়। এক ঘণ্টা পর আসে। আবার ভোরে চলে যায়। আসে সকালের দিকে। রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে বাচ্চারা গরমে ছটফট করতে থাকে।’ নগরের রাজাপুকুর লেনের বাসিন্দা পুতুল দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘তাদের বাসায় রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে ভোররাতে।’

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের বিদ্যমান উৎপাদন দিয়েই স্থানীয় গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। তবে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডের বণ্টন-নীতির কারণে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম থেকে টেনে নিয়ে রাজধানীসহ অন্যান্য এলাকার ঘাটতি মেটানো হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। সঞ্চালন লাইনের ওভারলোডিং এবং স্থানীয় বিতরণ সাবস্টেশনের দীর্ঘদিনের কারিগরি ত্রুটির কথাও কর্মকর্তারা তুলে ধরেন।