‘বরাবর
প্রক্টর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
বিষয়:
জনাব,
সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি মোছা. (জ্যাকুলিন-ছদ্মনাম), বিভাগ: সংস্কৃত, শিক্ষাবর্ষ: (---)। বিগত ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মহসিন আলম আমাকে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে থাকে।
আমায় প্রেমের প্রস্তাব দেয় যা আমি প্রত্যাখ্যান করি এবং ২৫ তারিখ বিকেল ৩টায় আমায় জোরপূর্বক পদ্মার পাড়ে নিয়ে পুনরায় প্রেমের প্রস্তাব দিলে আমি আবার তা প্রত্যাখ্যান করি। এরপর সে আমায় চাকু বের করে বিভিন্ন হুমকি দিতে থাকে এবং পিস্তলের ভয় দেখায়।

পরে আমি কান্নাকাটি করার পর আমায় মেসের দিকে নিয়ে আসে এবং পুনরায় রুয়েট থেকে পদ্মার পাড় নিয়ে গিয়ে পদ্মায় ফেলে দেবার হুমকি দেয়।
এরপর আমি কান্নাকাটি করায় মেসে নিয়ে আসে। ২০-৩০ মিনিট পর বিভিন্ন নম্বর থেকে আমার ফোনে ফোন আসে এবং আত্মহত্যা করেছে এমন হুমকি দেয় এবং আমায় বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করার হুমকি দেয়।
মোছা. (জ্যাকুলিন-ছদ্মনাম)’
গত ২৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর এই অভিযোগপত্রটি জমা দেন জ্যাকুলিন (ছদ্মনাম) নামে ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগে উল্লিখিত ঘটনার জের গড়ায় রাকসু ভিপি সালাউদ্দিন আম্মারের বেলচা হাতে ছবি ভাইরাল হওয়া পর্যন্ত।
মহসিন আলম কীভাবে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন জ্যাকুলিন এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে অভিযোগের কপিটি তিনি এশিয়া পোস্টকে সরবরাহ করেন এবং জানান, আমার যা বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
কী ঘটেছিল সেদিন
জানা যায়, জ্যাকুলিনের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন রাতেই সংশ্লিষ্টদের (মহসিন উপস্থিত ছিলেন কি না) তলব করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। তাদের নিয়ে নিজ দপ্তরে সভা ডাকেন। সভায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন উপস্থিত হয়ে মহসিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ সময় তারা প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন। ফলে ওই সভায় বিষয়টি সুরাহা করা সম্ভব হয়নি।
সেদিনের ঘটনা নারীঘটিত এবং আনাস প্রক্টরের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়ানোর বিষয়টি এশিয়া পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন রাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান। তিনি বলেন, ঘটনাটি নারীঘটিত ইস্যু থেকেই শুরু হয়েছে। এ ইস্যুতে ডাকা সভায় আনাস আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি করলে আমি তাকে দপ্তর থেকে বের করে দিই।
পরদিন সোমবার দুপুরে আবারও সভা ডাকেন প্রক্টর। সেখানে রাকসু নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তার ছবি দেখতে পান। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মারের সঙ্গে আনাসের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, পরদিন আমরা আবার যখন সভায় বসি তখন আনাস এসে আমাকে জেরা করতে থাকে। একপর্যায়ে রাকসু জিএস ও এজিএসের সঙ্গে আনাসের হাতাহাতি হয়।
ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে ছবি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আনাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, অতীতে আমার বন্ধুরা হয়তো ছাত্রলীগ করত, কোনো এক জায়গায় তাদের সঙ্গে ছবি থাকতে পারে। কিন্তু ছাত্রলীগের কোনো ব্যানার-ফেস্টুনে আমার ছবি নেই।
এ সময় সালাহউদ্দিন আম্মার আনাসকে মারধর শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন আনাস। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আম্মার প্রক্টর অফিসে লোক নিয়ে এসে আমাকে মারধর শুরু করেন। এরপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি।
তবে এ ঘটনার জেরে ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে আনাসসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে ঢুকে আম্মারসহ অন্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন আম্মার ও তার সঙ্গীরা। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। হামলার পর হামলাকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের (লাইব্রেরি) পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন।
তবে আনাসের দাবি, কেউ হয়তো রাকসু ভবনের সামনে তাদের সঙ্গে হাতাহাতি করে। এরপর আম্মার লোকজন নিয়ে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আবার আমাকে মারধর করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আনাসকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ প্রক্টর দপ্তরে এসেছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে আমি পুলিশকে গ্রেপ্তার না করতে বলি। কিছুক্ষণ পর শুনি, সে কয়েকজনকে নিয়ে রাকসু ভবনে হামলা চালিয়েছে। এরপর বের হয়ে দেখি আনাসরা লাইব্রেরির রিডিং রুমের দিকে ও আম্মারসহ আরও কয়েকজন এক পাশে থেকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করছে। সেখানে গিয়ে আনাসদের চলে যেতে বলি, কিন্তু ওরা আবার বাগ্বিতণ্ডা হয়। এরপর বাইরে রাকসু ও হল সংসদের অনেকেই জড়ো হলে আবারও মারধরের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই সালাহউদ্দিন আম্মার বেলচা হাতে লাইব্রেরির সামনে হাজির হন এবং ওই তিন শিক্ষার্থীকে হুমকি দেন। একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা প্রক্টরকে সরিয়ে লাইব্রেরির ভেতরের পাঠকক্ষে ঢুকে পড়েন। ভেতরে ঢুকে তারা ওই তিন শিক্ষার্থীকে মারধর করেন যা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানোর সময়ও মাহমুদুল হাসান মাহিন নামের এক শিক্ষার্থীকে নামিয়ে পুনরায় মারধর করা হয়।
এদিকে ঘটনার পর সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন রাকসু ও হল সংসদের নেতারা। এরপর উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তারা। বৈঠকের ঘণ্টাখানেক পর অভিযুক্ত আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে গ্রেপ্তার করে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)।
এ বিষয়ে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব এশিয়া পোস্টকে বলেন, আনাস প্রক্টর অফিস থেকে বের হয়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে রাকসু ভবনে এসে জিয়া হলের জিএস আরিফকে খুঁজতে থাকে। আমি বলি, আরিফ জিয়া হলে থাকবে, রাকসু ভবনে কেন খুঁজতে আসছেন? এরপর আনাসসহ কয়েকজন রাকসু জিএসের কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে আনাসের সঙ্গে থাকা ছাত্রদলের কয়েকজন মিলে আম্মারের ওপর হামলা করে। তাদের হামলা ঠেকাতে গিয়ে আমার বাঁ হাতে আঘাত লাগে। এরপর হামলাকারীরা রাকসু ভবন থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির দিকে চলে যায়। সেখানে আবার তাদের সঙ্গে আমাদের হাতাহাতি হয়। পরে প্রক্টর স্যার তাদের লাইব্রেরি থেকে সেফ এক্সিট দেন।
এ বিষয়ে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, প্রক্টর স্যারের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার কারণে আনাসের সঙ্গে আমাদের হাতাহাতি হয়। সে সময় আমরা পুলিশ ডেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রক্টর স্যার তাকে গ্রেপ্তার করতে দেননি। এরপর তারা রাকসু ভবনে হামলা চালায়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএসের কক্ষে ঢুকে কীভাবে হামলার সাহস পায়? আমি কি নিরাপত্তা ডিজার্ভ করি না?
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আইনের হাতে তুলে দিয়ে দেখলাম তো কী করতে পারল। আপনাদের সামনেই তো আইনের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম। আইন কতটুকু আমাদের ইনসাফ দিতে পারল? দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণেই আজ এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর দায় আমি কাকে দেব? আইনকে, নাকি প্রশাসনকে? যখন তারা ব্যবস্থা নিতে পারছে না, তখন তো আমাকে নিতে হবে।
রাকসু এজিএস ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা সালমান সাব্বির বলেন, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় আনাসের সঙ্গে আমাদের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর আমি পুলিশকে ফোন করে নিয়ে এলেও প্রক্টর স্যার তাকে গ্রেপ্তার করতে দেননি। আমরা কেন মেয়েটির পক্ষ নিয়েছি, তা নিয়ে প্রক্টর দপ্তরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আনাস তার দলবল নিয়ে রাকসু ভবনে হামলা চালায়।
তিনি আরও বলেন, হামলার পর আমরা প্রক্টর স্যারকে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসি। এ সময় আনাসরা লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে সালাহউদ্দিন আম্মারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে আনাস তার একজন সহযোগীকে পিস্তল নিয়ে আসতে বলে। এরপর আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং মারধরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
সিনেট সদস্য ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা ফাহিম রেজা এশিয়া পোস্টকে বলেন, নারীঘটিত ইস্যুতে যখন প্রমাণ পাওয়া গেল আনাস নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত, তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা হলে ঘটনা এতদূর গড়াত না। প্রক্টর অফিস থেকে নিরাপদে বের হওয়ার পরই তারা রাকসু ভবনে হামলা চালায়। পরে তারা লাইব্রেরির দিকে চলে গেলে সেখানে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও আমরা তাদের প্রতিহত করি।
এদিকে সংঘর্ষ ও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে গত ২৮ জুলাই ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ৩০ জুলাই মারধরের শিকার মাহমুদুল হাসান মাহিনের বাবা বাদী হয়ে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ আট শিবিরের নেতা এবং অজ্ঞাত ১৭-১৮ জনকে আসামি করে মতিহার থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন।