জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে রিয়াজ মোর্শেদ নামে এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন– এমন তথ্য দিয়ে একটি মামলা করা হয়েছে। তবে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ তদন্তে নেমে বাদীর খোঁজ পায়নি। রিয়াজ মোর্শেদের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সে এলাকায় গিয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিয়াজ নামে কেউ মারা গেছেন কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়ায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়ের করা এই মামলার তদন্ত শেষ করতে পারছে না পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই খন্দকার সালেহ আবু নাঈম সমকালকে বলেন, বাদী রুমা বেগমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীর সঙ্গে বাদীর সম্পর্ক কী, তাও জানা যায়নি। বাদীর স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় একাধিকবার খোঁজ করেও তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী বলেছেন, রুমা নামে কেউ সেখানে থাকেন না।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, এজাহারে বলা হয়েছে নিহত রিয়াজের বাড়ি যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকায়। সেখানে গিয়ে বাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কোনো তথ্য না পাওয়ায় মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।
শুধু এই মামলাই নয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হতাহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া অনেক মামলার কূলকিনারা করা যাচ্ছে না সঠিক তথ্য না পাওয়ায়। হতাহতের ঘটনায় সারাদেশে দায়ের হওয়া এক হাজার ৮৬৫টি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। প্রায় দুই বছরে ২৫৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, যা মোট মামলার ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অন্য মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।
একই ঘটনায় ২ মামলা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় জুয়েল নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় নাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে আদালতে নালিশি আবেদন দাখিল করেন। আদালতের নির্দেশে একই বছরের ২১ ডিসেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হয়। ৩০ জনকে আসামি করা হয় এই মামলায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আশরাফুজ্জামান সমকালকে বলেন, তদন্তকালে জানা যায়, জুয়েলের সঙ্গে বাদীর আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। এ ঘটনায় জুয়েলের বোন বাদী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অরেকটি মামলা করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান বলেন, লাশ উত্তোলন করা হয়নি। সাক্ষ্যপ্রমাণও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বাদী যেহেতু নিহতের আত্মীয় নন, সে কারণে আরও সাক্ষ্যপ্রমাণ দরকার। মামলাটির তদন্ত
চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলাটিরও তদন্ত চলছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
পূর্বশত্রুতার কারণে মামলা
এস এম ইকরাম উদ্দিন শিহাব নামে এক ব্যক্তি তাঁর ছেলেকে দিয়ে সাবেক স্ত্রী আকলিমাসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে পিবিআই। আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তদন্তে জানা যায় মামলার বাদী এস এম ইফতেখার উদ্দিন নাদিমের বাবা ইকরাম উদ্দিন শিহাব ও মা আকলিমা আক্তারের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয় অনেক আগে। ইফতেখার বর্তমানে বাবার সঙ্গে থাকেন। বাদী দাবি করেছিলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কদমতলী থানা এলাকায় তাঁর মাথায় গুলি লেগেছে। কিন্তু তদন্তে জানা গেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকের কাছে তিনি শুধু ডান হাতের ব্যথার কথা উল্লেখ করে চিকিৎসা নিয়েছেন। এমনকি চিকিৎসক তাঁকে এক্স-রে করার পরামর্শ দিলেও তিনি আর হাসপাতালে যাননি। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ভিডিও ফুটেজে বা নিরপেক্ষ সাক্ষীর জবানবন্দিতে বাদীর আহত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিপুল সংখ্যক আসামি
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি বিপুল সংখ্যক। কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে নিহতের স্বজন দাবি করে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এমনকি মামলা করার আগে নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি। এ ছাড়া পূর্ববিরোধ, প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি মামলা ও আসামির বিরুদ্ধে থাকা তথ্যপ্রমাণ সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় বেশি লাগছে।
এদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারায় ৮৬২ মামলায় পাঁচ হাজার ৪১৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে, এর সত্যতা না থাকায় মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য সুপারিশ করা হয় বলে দাবি করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বিচার ব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৭৩ (এ) ধারা সংযোজন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মাধ্যমে হয়রানির উদ্দেশ্যে কারও নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্যবিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন। প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে আদালত অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে পারেন– এমন বিধান রাখা হয়েছে।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা
পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট এক হাজার ৮৬৫ মামলার মধ্যে হত্যা মামলা ৮০১টি। হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা এক হাজার ৬৪টি। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি এক লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত ১০১টি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে ৬৩টি মামলায় এবং ৩৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দেওয়া হয়। ৬৩টি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আসামি পাঁচ হাজার ৬৪৭ জন। হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ১৪০টিতে অভিযোগপত্র এবং ১৮টির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আদালতে। অভিযোগপত্রে মোট আসামি ১০ হাজার ৬৬১ জন।
গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর এলাকায়। মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানায় ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৭৯টি এবং অন্যান্য অভিযোগে মামলা ৩১০টি। হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩৫৪টি মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পুলিশের ৪১২ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ২৩ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদস্য ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই হাজার ১৪১ জনকে।
ডিএমপি সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭৮৯ মামলার মধ্যে ২১ জুলাই পর্যন্ত ৩৭টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ২৮টি।
জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৫৯টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ বিষয়ে সম্প্রতি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি মামলায় বিপুল সংখ্যক আসামি থাকায় তাদের অবস্থান, ভূমিকা এবং ফরেনসিক তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে ধাপে ধাপে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের প্রায় ৪০ জিবি ডেটা আছে। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাগুলো নিয়ে কাজ করছেন। আইনের ভেতরে থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন।
জুলাই আন্দোলন ঘিরে মামলা বাণিজ্যে জড়িতদের বিষয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো যাচাই-বাছাই হচ্ছে। কেউ যদি ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে মামলা করে থাকে, আমরা তাতে সায় দেব না। মামলাগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই চার্জশিট দেওয়া হবে।
জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত থানায় দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে ৮২টির তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ১৯৭টি সিআর মামলার তদন্ত করে সংস্থাটি। এগুলোর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১৯০টি। গত ২১ জুলাই পর্যন্ত মোট ২০৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৯টি ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১৫৯টি। ৭১টি মামলা তদন্তাধীন।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বেশকিছু মামলার তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর অধিকাংশের তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
তদন্তে বিলম্ব হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহতদের স্বজনদের অনেকে মরদেহ গ্রামে নিয়ে দাফন করেছেন। তাদের অনেকেই মামলা করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। দেখা গেছে, কিছু স্বার্থান্বেষী লোক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্বজন দাবি করে মামলার বাদী হয়েছেন। বেশ কিছু মামলায় ঘটনাস্থল ও ঘটনার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে এজাহারে। এতে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ের করা মামলাগুলোরও তদন্ত করতে হচ্ছে এবং প্রকৃত স্বজনদের এনে পরবর্তী সময়ে মামলা করানো হয়েছে। এ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে পরে বিপদে পড়তে পারে– এমন ভয় মানুষের মধ্যে প্রথম দিকে লক্ষ্য করা গেছে।