Image description

বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গলবার থেকে একটি ভিডিও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট্ট এক শিশুর কোলে আরেকটি শিশু। যে কিশোরীর কোলে শিশুটিকে দেখা যাচ্ছে, তার বর্তমান বয়স ১৩ বছরের কিছু বেশি। আর কোলে থাকা শিশুটির বয়স সাত মাস। সে ওই কিশোরীরই সন্তান।

অর্থাৎ, মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী সাত মাস বয়সী এক ছেলে শিশুর মা। শিশুটির জন্মদাতা মো. শাকিল মিয়ার বয়স ২২ বছর। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে কীভাবে এক সন্তানের মা হলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের বয়স কত, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা বিয়ে বৈধ কি না এসব বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

আইনজীবীরা জানান, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়েদের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। এর নিচে হলে সেই বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে।

যে কিশোরীকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা, গত বছর ঘটনার সময় সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা জুয়েল খান পেশায় ড্রাইভার। আর মা সৌদি আরবে চাকরি করতেন। ঘটনার সময় তিনি দেশে ছিলেন না। পরে দেশে ফেরেন। মেয়েটি টিকটকে ভিডিও তৈরি করত। ২০২৫ সালে টিকটকেই তার সঙ্গে মো. শাকিল মিয়ার পরিচয় হয়। 

মেয়েটির বাবা জুয়েল খান বলেন, গত বছর প্রথমবার তার মেয়েকে নিয়ে সাত দিন রাখা হয়েছিল। তখন তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সাত দিন পর মেয়েটি বাড়িতে ফিরে আসে। এরপর ১৫ দিন পর আবার তাকে ফুঁসলিয়ে ১১-১২ দিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

জুয়েল খান বলেন, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তাদের বিয়ে করানো হয়েছে। তিনি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার ভাষ্য, এভাবে কি মানুষ বিয়ে করে? তিনি আরও বলেন, কোনো কাবিন হয়নি। আদালতও বলেছে এটি কাবিন নয়। কাজীও একই কথা বলেছেন। তাহলে তার মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

মেয়েটির বর্তমান বয়স ১৩ বছর ৪ মাস ২৩ দিন। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার বয়স ২২ বছর। জুয়েল খান জানান, শাকিল মিয়া তার মেয়েকে কেরানীগঞ্জের একটি স্থানে নিয়ে যান। পরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মেয়ে সাত মাস একদিন বয়সী শিশুটির জন্ম দেয়। তবে প্রায় তিন মাস আগে শিশুটিকে রেখে অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার পরিবার মেয়েটিকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে গত ২০ মে নিজের সন্তানকে ফেরত চেয়ে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অভিযোগ করেন ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরী। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খানের নির্দেশে গত ১৬ জুলাই সাত মাস বয়সী শিশুটিকে নিয়ে উভয় পক্ষ হাজিরা দেন। পরে লিগ্যাল এইড অফিসারের নির্দেশে সোমবার ঢাকার চকবাজার থানা-পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে। 

এই সপ্তাহের মঙ্গলবার লিগ্যাল এইড অফিসার শিশুটিকে তার কিশোরী মায়ের কাছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বা জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সভাপতিত্বে উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। এই মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত হয় এবং এটি বিনামূল্যের আইনি উদ্যোগ।

এই ঘটনাকে ধর্ষণ দাবি করে জুয়েল খান বলেন, শুনানির দিন তিনি শাকিল মিয়ার কঠোর শাস্তি দাবি করবেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত মো. শাকিল মিয়া দাবি করেছেন, বিয়ের সময় মেয়েটির বয়স ২০ বছর ছিল।

তিনি বলেন, মেয়েটির বাবা বয়স কমিয়েছেন। জন্মনিবন্ধনের কাগজে তিনি ২০ বছর বয়স দেখেছেন। কাবিনেও ২০ বছর লেখা ছিল। পরে আদালতে গিয়ে দেখেন, একটি কাগজে বয়স ১৩ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযুক্ত শাকিল মিয়ার বাড়ি ঢাকার চকবাজারে। মেয়েটির বাড়ি হাজারীবাগ এলাকায়। ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। একই সঙ্গে মেয়েটিকে তুলে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।

শাকিল মিয়া বলেন, মেয়েটি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে গিয়েছিল। পালিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি তাকে বলেছিল, তার বাবা-মা অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেছে। তিনি যদি নিয়ে না যান, তাহলে সে আত্মহত্যা করবে। পরে বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে যান।

তিনি আরও জানান, পরে মেয়েটির বাবার কাছ থেকে জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ করেন। সেখানে মেয়েটির বয়স ২০ বছর লেখা ছিল বলে দাবি করেন। বিয়ের কাবিনেও ২০ বছর উল্লেখ ছিল বলে জানান তিনি।

শাকিল মিয়ার দাবি, তিন মাস আগে মেয়েটি তার বাবা স্ট্রোক করেছেন বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। শিশুটিকে তার পরিবারের কাছেই রেখে যায়। এক ঘণ্টার জন্য যাওয়ার কথা বলে তিন মাস ধরে কোনো খোঁজখবর নেয়নি। এমনকি শিশুরও কোনো খোঁজ নেয়নি। এরই মধ্যে শিশুটির অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেছেন শাকিল মিয়া।

তবে শিশুটি বর্তমানে কিশোরী মায়ের কাছে থাকলেও ভবিষ্যতে কার কাছে থাকবে, সে বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শুনানি হবে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি যখন কিশোরীর সন্তান জন্ম হয়, তখন তার বয়স ছিল ১২ বছর ৪ মাস।

কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জানান, শিশুটিকে রেখে মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হলেও তার মা সৌদি আরবে থাকায় বাবা তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। থানাও সহযোগিতা করেনি। এর মধ্যে শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে ছেলের মা মামলা করেছেন বলে মেয়েটির পরিবার জানতে পারে।

পরে মেয়েটির মা দেশে ফিরলে তারাও আইনি পদক্ষেপ নিতে লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে যান বলে জানান তিনি।

মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট মেয়েটির বক্তব্য শুনে শিশুটিকে উদ্ধার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছেন। তার নিজেরও ট্রমা হয়েছিল। কীভাবে এত কম বয়সী একটি মেয়ে স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্ম দিল তা ভেবে তিনি অবাক হয়েছেন।

নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে শাকিল মিয়ার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, এই বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের শুনানিতে ছেলেপক্ষের আইনজীবী তালাক হয়েছে দাবি করে শিশুর অভিভাবকত্ব চাইলে তিনি বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, এত ছোট একটি মেয়ের ক্ষেত্রে তালাকের প্রশ্নই আসে না। আগে দেখতে হবে বিয়েটি কীভাবে হলো। আইনে ১৮ বছর না হলে বিয়েই হয় না। আর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কোনো আইনেই এ ধরনের বিয়েকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

দেশের আইন অনুযায়ী এই বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই উল্লেখ করে মৃণাল কান্তি মিত্র জানান, এ কারণে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে নতুন শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন।

উল্লেখ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ সংশোধনী এনে ২০২৬ সালে একটি বিল পাস করা হয়।

সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, কোনো ব্যক্তি যৌনসম্পর্ক করলে তাকে ওই নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য করা হবে।

মৃণাল কান্তি মিত্র জানান, ১৬ বছরের নিচে যত ভুক্তভোগী থাকবে, তাদের বিচার হবে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে। ঢাকার একমাত্র ট্রাইব্যুনালেই তিনি এই মামলা করবেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীর ফলে আপসের কোনো সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ১৮ বছরের নিচে যত ভুক্তভোগী থাকবে, তাদের কোনো জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী প্রমাণসাপেক্ষে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ড দুই ধরনের বিধানই রয়েছে। আইনটি আরও কঠোর করা হয়েছে। এখানে আপসের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়েদের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একটি সহায়িকায় বাল্যবিবাহ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, বয়সের শর্ত পূরণের পাশাপাশি বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের স্বেচ্ছাসম্মতি থাকতে হবে। জোরপূর্বক সম্মতি আদায় করা হলে সেই বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে বলেও সহায়িকায় উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে নির্ধারিত বয়সসীমার নিচে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে হলে সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের বিয়ে বৈধ নয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবর্ণা সীমা বলেন, দেশের আইনে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী নোটারি পাবলিকের বিয়ের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই এবং একে বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হয় না।

তিনি জানান, নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করলে পরবর্তীতে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দেনমোহর, উত্তরাধিকার বা খোরপোষের মতো কোনো আইনি অধিকার দাবি করা যায় না। এ ছাড়া বয়স গোপন করে বাল্যবিবাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে নোটারি এফিডেভিট ব্যবহার করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী কেবল নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বিয়েই আইনত বৈধ।

একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও নিজ নিজ ধর্মীয় আইন ও নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে ম্যারেজ সার্টিফিকেটও সংগ্রহ করতে হবে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অবৈধ বিবাহ এবং তালাক কার্যক্রম বন্ধে ২০১৯ সালে আইন মন্ত্রণালয় নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছিল।