Image description

বছরের প্রথম সাত মাসেই হামে আক্রান্ত কয়েক লাখ মানুষ। যার বড় অংশই সেরে উঠলেও কাটেনি সংকট। শরীরে দেখা দিচ্ছে ‘ইমিউনিটি অ্যামনেশিয়া’। এতে দুই থেকে তিন বছরের জন্য ধ্বংস হয়ে যায় আগের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। যেকোনো

ভাইরাস খুব সহজেই কাবু করছে শরীরকে। এরই মধ্যে  অনুকূল আবহাওয়ায় ডানা মেলছে ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে এবার হামে আক্রান্তরা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। হামের দুর্বলতার ওপর ডেঙ্গু যেন এক বিষফোড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর রূপ বদল বা নতুন ‘সেরোটাইপ’। সবমিলিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। দেশে চিকিৎসাব্যবস্থায়ও রয়েছে নানা ঘাটতি। এতেও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্ত তুলে ধরছে এক ভয়াবহ চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রাজিলে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু মৃত্যুহারে তাদের সবাইকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন শীর্ষে। হাম আর ডেঙ্গুর জোড়া ধাক্কায় সংকটে সাধারণ মানুষ।

ডেঙ্গু কয়েক দশক ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ থাকলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনায় রোগী বাড়ছে হুহু করে। ময়মনসিংহে রোগী কম হলেও মৃত্যু বেশি। ঢাকার বাইরে মশার লার্ভা বহুগুণ বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় নিধন অভিযান কম। বর্ষা এলেই বাড়ে তোড়জোড়। শুরু হয় মৌসুমভিত্তিক কাজ। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এতে মিলবে না সমাধান। বছর জুড়েই চালাতে হবে মশা নিধন অভিযান। নয়তো পুরো দেশ পড়বে চরম ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের রাখা হয় কমিটিতে। নেওয়া হয় নানা পরামর্শ। কিন্তু বাস্তবে সেসব পরামর্শের নেই বাস্তবায়ন। ঘুরেফিরে পুরনো পথেই হাঁটে সরকার। কার্যকর হয় না কোনো দিকনির্দেশনা। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বছর জুড়েই ডেঙ্গু রোগী মিললেও বর্ষাকালে বেড়ে যায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বর্ষায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ে বলে সরকারও এই সময়ে এসে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মৃত্যু ঠেকাতে তৎপর হয়ে ওঠে, নানা পদক্ষেপ নেয় বলে জানালেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘সারা বছর মশার উৎস ধ্বংস না করে মৌসুমভিত্তিক কর্মসূচিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উল্টো পুরো দেশই এখন ডেঙ্গুর মারাত্মক ঝুঁকিতে। বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।’

মৃত্যুহার বেশি বাংলাদেশে: ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরে দেশে ১৫ হাজার ১৫৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৫৩ জন। এর মধ্যে জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৫ জন। শ্রীলঙ্কায় একই সময়ে ৭৬ হাজার ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও মারা গেছে ৫৭ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বাস্থ্যবিষয়ক সর্বশেষ বুলেটিনের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুতে বাংলাদেশের মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ, ভারতে এই হার শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ আর পাকিস্তানে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্যবিষয়ক কয়েকটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গুতে আক্রান্তের ৮১ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে, তাদের মৃত্যুহার বাংলাদেশের ১০ ভাগের ১ ভাগ। এরপর ব্রাজিলে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও মৃত্যুহার বাংলাদেশের ১২ ভাগের ১ ভাগ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে মৃত্যুহার বাংলাদেশে সব রোগই তুলনামূলক বেশি। ডেঙ্গুতে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে মৃত্যু হার বেশি। ডেঙ্গুর সেরোটাইপ পরিবর্তনে ডেঙ্গু এমন মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সেকেন্ডারি লেভেলে চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাটতিও মৃত্যু বাড়ার অন্যতম কারণ।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দিন হায়দার অবশ্য মৃত্যুহার বেশির জন্য দেশে মানুষের ঘনবসতি, মশার প্রজননের জন্য উপকূল আবহাওয়া, ছাদবাগান, নাগরিকদের পুষ্টিহীনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রবৃত্তিকে দায়ী করেছেন। 

রোগী বাড়ছে ঢাকার বাইরে: সরকারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ঢাকার বাইরে রোগী বাড়তে থাকে। ২০২১ সালেও ঢাকায় ৮৯ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়। এর পরের বছরই কমে সে হার হয়ে যায় ৬৩ শতাংশ। এরপর থেকে ঢাকার রোগী কমার হার অব্যাহত, অবশ্য ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়েছিল। চলতি বছরে ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার ৩৮ শতাংশ। মৃত্যুও বেশি ঢাকায়।

ঢাকার বাইরে বরিশাল বিভাগে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, চলতি বছরে রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৩০৮। এর পরেই আছে চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগ। ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত তুলনামূলক কম হলেও মৃত্যুহার বেশি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানালেন, এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের (বিআই) মাধ্যমে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যে মাত্রায় মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাতে সারা দেশই ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকিতে। ঢাকার বাইরে এখন উচ্চমাত্রার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, সে তুলনায় নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা কম।

বাস্তবায়ন হয় না বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেন করা যাচ্ছে না জানতে কথা হয় দুজন কীটতত্ত্ববিদ ও দুজন জনস্বাস্থ্যবিদের সঙ্গে। তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে রাখা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়। কিন্তু সেসব পরামর্শের বাস্তবায়ন হয় না। সরকার গতানুগতিক সেই পুরনো পদ্ধতিতেই মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলছিলেন, কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। আর এতে ফলও মিলছে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বছরব্যাপী একই গুরুত্ব দিয়ে চালাতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনও বলছেন, তাদের পরামর্শ আমলে নিচ্ছে না সরকার। কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ নিতে হবে। কমিউনিটিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শতভাগ কাজে না লাগালে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। যেখানেই রোগী মিলবে খুঁজে খুঁজে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দিন হায়দার বললেন, ‘তাত্ত্বিক জায়গা থেকে যেকোনো পরিস্থিতিতে কী করণীয় এবং বাস্তবে কী করা হচ্ছে— একটা ফাঁক থাকে। সে জায়গা থেকে তারা এ অভিযোগ তুলতে পারেন। সরকারের পাশাপাশি জনগণ সচেতন হলে এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই শুধু এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলতে পারে।