ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়া কিংবা তুষারপাতের ক্যানাডায় ‘উচ্চ বেতনের চাকরি ও স্থায়ী আবাসন’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চকচকে বিজ্ঞাপনে ঠিক এমনই এক মেকি স্বপ্নের জাল বুনেছিল ওরা। আর সেই জালে পা দিয়েই কোটি টাকা হারিয়ে এখন নিঃস্ব দেশের বহু বিদেশগামী তরুণ। নিখুঁতভাবে ক্যানাডার ‘এলএমআইএ’ (LMIA) কিংবা অস্ট্রেলিয়া সরকারের হুবহু নকল ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইট বানিয়ে অভিনব কায়দায় চলছিল প্রতারণা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; ডিবি সাইবার অপরাধ বিভাগের সাঁড়াশি অভিযানে অবশেষে ধরা পড়েছে এই চক্রের মূল দুই হোতা।
আটককৃতরা হলেন—২১ বছর বয়সী মারিফুল ইসলাম এবং ২৮ বছরের ‘বাচ্চা বাউ’ ওরফে হাসিনুর। শুক্রবার (৩১ জুলাই) ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী ডিবির অভিযানের তথ্য জানান।
ইন্টারনেট ঘেটে জানা গেছে, 'এলএমআইএ (Labour Market Impact Assessment)' হলো কানাডা সরকারের এমন একটি অনুমোদন, যা বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে। তবে এটি কোনো ভিসা বা কানাডায় প্রবেশের অনুমতিপত্র নয়। প্রতারক চক্রটি এই এলএমআইএর ভুয়া কপি দেখিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের বিশ্বাস অর্জন করত।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ছায়েদুল হক নামে এক যুবক। চক্রটির চটকদার কথায় বিশ্বাস করে ধাপে ধাপে মেডিকেল ফি, ভিসা প্রসেসিং ও ডকুমেন্ট চার্জের নামে বিকাশ-রকেটের মাধ্যমে তুলে দেন প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর শুরু হয় টালবাহানা। একপর্যায়ে পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় আরও উল্টো চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে ছায়েদুল ছোটেন পল্লবী থানায়, দায়ের করেন মামলা।
মামলার সূত্র ধরে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার নির্জন এক এলাকায় হানা দেয় ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হয় মারিফুল ও হাসিনুরকে। অভিযানে উদ্ধার করা হয় প্রতারণার মূল হাতিয়ার—১টি আধুনিক ল্যাপটপ, ৭টি স্মাটফোন, ১৩টি ভুয়া সিম এবং ৯টি বাংলাদেশি জাল পাসপোর্ট।
প্রতারণার ভয়ংকর ডিজিটাল কৌশল
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছে, তারা কেবল সাধারণ চোর নয়, রীতিমতো 'ডিজিটাল জালিয়াত'। চাকরিপ্রার্থীদের ফাঁদে ফেলতে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে একটি ভুয়া 'ভিসা ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইট' তৈরি করেছিল তারা। ভুক্তভোগীরা ওই সাইটে পাসপোর্ট নম্বর দিলে দেখা যেত ‘ভিসা অ্যাপ্রুভিড’! ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ও ' ভিসা অ্যাপ্রুভাল লেটার (Visa Approval Letter)' দেখিয়ে অন্তত ৭২ জনেরও বেশি মানুষের কাছ থেকে চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দ করা ডিভাইসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেন এবং বহু প্রতারিত যুবকের তথ্যাদি পাওয়া গেছে। দীর্ঘ দিন ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের আখের গুছাচ্ছিল।
ডিবির সতর্কবার্তা: ফাঁদে পা দেওয়ার আগে জানুন
বৈধতা পরীক্ষা: যেকোনো সংস্থায় টাকা দেওয়ার আগে সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স যাচাই করুন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় না: ফেসবুকে চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে অপরিচিত কারোর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেন থেকে বিরত থাকুন।
অরিজিনাল সাইটে চোখ: সরকারি ওয়েবসাইট বা সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের অফিসিয়াল পোর্টাল ছাড়া অন্য কোনো লিংকে বিশ্বাস করবেন না।
আইনের আশ্রয়: প্রতারণার লক্ষণ টের পেলেই দ্রুত নিকটস্থ থানা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানান।