মুফতি সাইফুল ইসলাম
বাজার একটি সমাজের কেনাবেচার স্থানের পাশাপাশি এটি সমাজের নৈতিকতারও আয়না। যেখানে একদিকে যেমন লেনদেনে থাকে সততা, মানুষের মধ্যে জন্মায় আস্থা; তেমনি সেখানে প্রতারণা, ভেজাল ও কারচুপিও বাসা বাঁধে।
আজ আমাদের চারপাশে খাদ্যে ভেজাল, কম ওজন, নকল পণ্য ও মিথ্যা প্রচারণার যে উদ্বেগজনক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে; তাতে শুধু আইন ভঙ্গই হচ্ছে না; নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ও ডানা মেলছে। এ প্রেক্ষাপটে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মুতাফফিফীনের প্রথম তিনটি আয়াত আমাদের জন্য এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা বহন করে।
সেখানে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যখন তারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়; আর যখন তাদের জন্য মেপে দেয় বা ওজন করে, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১-৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ব্যবসায়িক প্রতারণার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘ওয়াইল’ শব্দটি ধ্বংস, দুর্ভোগ ও কঠিন শাস্তির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের অধিকার নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এখানে শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম ওজন দেওয়ার কথা বলঅ হয়নি। বরং যেকোনো ধরনের অসততা, প্রতারণা এবং অন্যের ন্যায্য অধিকার খর্ব করার বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে।
সময়ের প্রবাহে আজ প্রতারণার ধরন বদলেছে, কিন্তু অপরাধের প্রকৃতি বদলায়নি। খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো, দুধে ভেজাল, নকল ওষুধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, অনলাইনে এক পণ্যের ছবি দেখিয়ে অন্য পণ্য সরবরাহ, কিংবা ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে কারচুপি, সবই এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজের মাধ্যমে মানুষ শুধু আর্থিক ক্ষতির শিকার যেমন হচ্ছে; তেমনি অনেক সময় ভোক্তার স্বাস্থ্য, জীবন ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়তে দেখা যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায়িক সততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) স্তূপীকৃত খাদ্যশস্যের পাশ দিয়া যাচ্ছিলেন। তখন তিনি স্তূপের মধ্যে হাত ঢুকালেন। তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো আদ্র দেখতে পান। তিনি বললেন, হে খাদ্যশস্যের মালিক! এটা কি? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসুল বললেন: কেন তুমি ভিজা অংশ খাদ্যশস্যের উপরে রাখনি, যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়। যে ব্যাক্তি ধোকা দেয় সে আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না। (মুসলিম, হাদিস: ১০২) এই হাদিসে প্রতারণার প্রতি ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন মুসলমানের পরিচয় হবে সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা, প্রতারণা নয়।
অন্যদিকে ইসলাম সৎ ব্যবসায়ীদের সুসংবাদও দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯) অর্থাৎ ব্যবসা কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে পরিচালিত হলে তা ইবাদতেও পরিণত হতে পারে।
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ন্যায্য মাপ ও ওজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা ন্যায্যভাবে পূর্ণ মাপ দাও এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৫) হজরত শুয়াইব (আ.)-এর জাতিকেও একই নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছিল, মানুষের প্রাপ্য কমিয়ে দিও না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। (সুরা হুদ, আয়াত: ৮৫)
এসব আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন ব্যবসায়ী শুধু ক্রেতার কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহির জন্য দায়বদ্ধ। তাই সাময়িক লাভের আশায় প্রতারণা করে মানুষের হক নষ্ট করা কখনোই একজন মুমিনের পথ হতে পারে না। একটি নিরাপদ বাজার, সুস্থ অর্থনীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে ব্যবসায়ী, উৎপাদক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা, সবার মধ্যেই সততা ও আল্লাহভীতি জাগ্রত হতে হবে। কারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও, মহান আল্লাহর কাছে কোনো প্রতারণাই গোপন থাকে না।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক