দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদন
ইয়াবা। বস্তি থেকে অভিজাত— সবখানেই সমান ‘দাপট’। সীমান্তের জাদু ঘোড়া। সরকার বাহাদুরের পাইক-বরকন্দাজ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়েছে ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’র সব মুলুকেই। দেশের নিষিদ্ধ মাদক তালিকায়ও ‘ক্লাস-এ’! থাই পরিভাষায় ‘পাগল করা ওষুধ’। অথচ ভয়ংকর এ নেশাদ্রব্যটির উদ্দাম ‘জলসা’ চলছে বাংলাদেশে। আয়ারল্যান্ডের দৈনিক দ্য আইরিশ টাইমসের ভাষায়, ‘রীতিমতো মহামারী’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে লাখো মানুষ এ মাদকে আসক্ত। ক্রমেই বাড়ছে। সরেজমিনে এ প্রতিবেদনটিতে একজন আসক্তের গল্পকথার মাধ্যমে দেশের ‘ইয়াবা নাচন’ দৃশ্য তুলে ধরেছে পত্রিকাটি।
প্রতিদিন পোষা পাখিটির সঙ্গে সময় কাটাতেন ‘মেটালফ্রিক’। আদর করতেন। খাঁচা পরিষ্কার করতেন। উড়তেও দিতেন। এখন আর সেসবের কোনোটিই করেন না তিনি। ঢাকার অগোছালো শোয়ার ঘরে শুয়ে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এ ব্যক্তি বললেন, ‘এখন আর শরীর টেনে এসব করতে পারি না আমি। কে আর এসবের পরোয়া করে?’
নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে ‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ইয়াবার প্রতি তার আসক্তি দিন দিন বেড়েছে। এ আসক্তি তার জীবনকে ক্রমেই অচল করে তুলছে। একই সঙ্গে ধ্বংস করছে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন।
ইয়াবা সেবনের জন্য টিনফয়েলের ওপর একটি ট্যাবলেট রাখেন মেটালফ্রিক। নিচ থেকে আগুনে গরম করেন। এরপর ধোঁয়া টেনে নেন। তার দাবি, প্রতিটি কমলা রঙের ট্যাবলেটের প্রভাব থাকে ৪-৫ ঘণ্টা। টানা তিন দিন জেগে থাকেন। এরপর ভেঙে পড়েন। ঘুমান ১২ ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। ‘মানুষকে পশু বানিয়ে দেয় এই পাগল করা ওষুধ। আমার মাথাটা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে এই জিনিস’— বললেন মেটালফ্রিক।
গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন মেটালফ্রিক। তিনি বলেছেন, অন্য প্রায় সব মাদককে সরিয়ে এখন জায়গা দখল করেছে ইয়াবা। ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যেই ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায় তরুণদের— এমন দাবিও করেন তিনি। তার ভাষ্য, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোররা ইয়াবার ছোট প্যাকেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রিকশাচালকরা সেখান থেকে কিনে নেন।
একসময় একটি ব্যবসাও পরিচালনা করতেন মেটালফ্রিক। পরে আগুনে পুড়ে যায় সেই প্রতিষ্ঠানের ভবন। তার সন্দেহ, ঘটনাটি পরিকল্পিত। যদিও অন্যদের ধারণা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। নতুন সিনথেটিক ও সেমিসিনথেটিক মাদকের আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও মন্তব্য করলেন তিনি। চলতি মাসে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখে একটি বিলও পাস করেছে জাতীয় সংসদ।
২০১৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময় ইয়াবাবিরোধী অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কয়েক মাসের ব্যবধানে নিহত হন ২০০ জনের বেশি মানুষ। অনেকের মতে, অভিযানের ধরন ছিল ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-এর মতো।
এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দাবি, ২০১৮ সালে নিহত হন ৪৬৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতকিছুর পরও ইয়াবার ব্যবহার কমেনি; বরং বেড়েই চলেছে। ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাজ করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান। তিনি বললেন, সারা দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে একজন চিকিৎসককে কখনো কখনো এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী দেখতে হয়। কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, একসময় এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাকচালকের মতো পেশাজীবীরা ব্যবহার করতেন ইয়াবা। তবে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে এটি তরুণদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছিল। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ বিশ্বের অন্যতম বড় সিনথেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে।