Image description

বাংলাদেশের গ্যাসের ঘাটতি এখন কেবল জ্বালানি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রূপ নিয়েছে শিল্প খাতে বড় বিপর্যয়ে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিনিয়োগ। সেই সঙ্গে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা।

উদ্যোক্তারা জানান, নতুন শিল্প সংযোগ বন্ধ থাকা, নিজস্ব উৎপাদন হ্রাস এবং এলএনজি আমদানির সীমিত ক্ষমতার কারণে দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।

দেশজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে আংশিক চালু বা বন্ধ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল মূলধন ও ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, গত কয়েক বছরে ১৫ লাখ চাকরি হারিয়ে গেছে।

উৎপাদন না থাকলেও অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন দিয়ে যাচ্ছে। এতে নগদ অর্থের রিজার্ভ শেষ হয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধের ঝুঁকি বাড়ছে। এই অনিশ্চয়তা নতুন শিল্প বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ১৪ জুলাই এক চিঠিতে জানায়, পূর্বে অনুমোদিত ১ হাজার ৮৫৭টি গ্যাস সংযোগের আবেদন ঝুলে আছে। দেশীয় উৎপাদন অপর্যাপ্ত এবং এলএনজি আমদানি দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় নতুন কোনো সংযোগ বা লোড বৃদ্ধি বিবেচনা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশের প্রতিদিন প্রায় ৩৮৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১২৮ কোটি ঘনফুট।

মহেশখালী এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটির কারণে সম্প্রতি জাতীয় গ্রিড থেকে দৈনিক ৫০ কোটির বেশি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়। এতে প্রায় এক পঞ্চমাংশ জোগান কমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে বিঘ্ন ঘটে।

তীব্র গ্যাস সংকট ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। ঢাকার কয়েকটি সিএনজি স্টেশন দিনভর বন্ধ ছিল। কম চাপের কারণে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় গ্যাসহীন থাকায় বৈদ্যুতিক চুলা বা প্রস্তুত খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। হোটেল, পরিবহন ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খরচ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে কারখানার ভেতরে।

বাংলাদেশ চামড়া শিল্প সমিতির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সবচেয়ে জরুরি শিল্প উপাদান। নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ ও অবকাঠামো ছাড়া বিনিয়োগকারীরা নতুন মূলধন বিনিয়োগ করবেন না।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সেবা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেকে তা পাননি। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে।

পারভেজ বলেন, ‘কেউ শত বা হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যদি প্রতিশ্রুতিমতো গ্যাস না পায়, তবে এই ঝুঁকির দায় কার?’ তিনি সেবা প্রদানে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণ চালুর দাবি জানান।

টেক্সটাইলের বাইরেও এই সংকট ছড়িয়েছে। পাটপড়াশী, কাগজ, কাঠ, প্লাস্টিক, স্টিল ও সুতা তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ রয়েছে এবং কম সক্ষমতায় চলছে।

বিটিএমএর তথ্যমতে, গত তিন বছরে প্রায় ৩০০ সুতাকল এবং সাড়ে তিনশর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে।

কাগজ শিল্পে উৎপাদন হ্রাসের চিত্র স্পষ্ট। প্রায় ১৪০টি কাগজকলের মধ্যে সচল রয়েছে মোটে ৪০টি। ফলে স্থানীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাগজ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। উৎপাদন ছাড়াই বছরের পর বছর বেতন দিয়ে উদ্যোক্তারা তাদের মূলধন হারিয়েছেন।’

তিনি জানান, প্রাথমিক বস্ত্র খাতে ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার এখন আটকে গেছে।

ক্ষমতা হ্রাসের কারণে আমদানিনির্ভরতাও বাড়ছে।

স্থানীয় মিলে তুলার সুতার পর্যাপ্ত চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গত বছর প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সুতা আমদানি করা হয়েছে, যা আগের বছরের দ্বিগুণ।

তিনি বলেন, ‘সুতা দেশেই উৎপাদিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো, কর্মসংস্থান বাড়ত এবং মূল্য সংযোজন ঘটত। কিন্তু আমরা আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছি।’

শওকত আজিজ রাসেল উল্লেখ করেন, ভারতের উৎপাদকরা কম বিদ্যুৎ খরচ, আর্থিক সহায়তা, যন্ত্রপাতি ও জমির সুবিধা বাবদ প্রায় ১৫ শতাংশ প্রণোদনা পান। আধুনিক মিল থাকা সত্ত্বেও এর ফলে ভারতীয় সুতা বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে ১২ শতাংশ কম দামে বিক্রি হয়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর রপ্তানিকারকদের স্থানীয় মূল্য সংযোজনের কঠোর শর্ত মানতে হবে। তখন এই চাপ আরও বাড়বে।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘স্থানীয় কোম্পানিগুলো ধ্বংস হলে কারখানা ও অর্থনীতি কে চালাবে?’

তিনি শুধু রপ্তানি খাত নয়, আমদানি বিকল্প শিল্পেও নীতি সহায়তার ওপর জোর দেন।

দেশীয় উদ্যোক্তাদের তৈরি করার মতো পণ্যও আমদানি করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি কাগজের উদাহরণ দেন।

‘কাগজকলগুলো গ্যাস না পেলে বই ও খাতার কাগজ কীভাবে উৎপাদন করবে? শেষ পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভরতা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম জানান, বৈশ্বিক মূল্য ও সরবরাহ অস্থিতিশীল থাকায় দীর্ঘ সময় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করা যাবে না। তিনি দ্রুত স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন এবং দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে বলেন, মাত্র দুটি এফএসআরইউর ওপর নির্ভরতা ব্যাকআপ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে একটি এফএসআরইউ বছরে ১৫ থেকে ২০ দিন বন্ধ থাকে। বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় সংকট এড়ানো সম্ভব নয়।

তিনি স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ বাড়াতে দ্রুত তৃতীয় এফএসআরইউ চালুর পরামর্শ দেন। তবে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোই টেকসই সমাধান।

এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ঘাটতি কিছুটা কমিয়েছে, তবে তা স্থায়ী অবকাঠামোর বিকল্প নয়।

তিনি দ্রুত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে সতর্ক করেন, দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন কমছে, কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে।
শিল্প খাতের এই সংকট জ্বালানির সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

উদ্যোক্তারা জানান, কম সক্ষমতায় চলা প্রতিটি কারখানা অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন কমায়, আমদানিনির্ভরতা বাড়ায়, রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল করে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘অর্থনীতির গতি ফেরাতে গ্যাস সংকটের সমাধান করতে হবে।’