চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৩৫টি ভোটকেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল সিসি ক্যামেরাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। এসব সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বাজারদরের চেয়েও দেড়গুণ-দ্বিগুণ দামে। সরকারি নথিতে দেওয়া দর ও স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ঘটনায় সব মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৩৫টি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য কেন্দ্রপ্রতি ৩২ হাজার ৮০০ টাকা হিসাবে মোট ১১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ৬টি করে মোট ২১০টি ২ মেগাপিক্সেল সিসি ক্যামেরা, ২১০টি পাওয়ার অ্যাডাপ্টার, ৩৫টি ৮-চ্যানেলের ডিভিআর, ৩৫টি ৫০০ জিবি হার্ডড্রাইভ, ৩৫টি ১৯ ইঞ্চি মনিটর, ৪২০টি ভিডিও ব্যালুন, ক্যাট-৬ কেবল ও সার্ভিস চার্জ দেখানো হয়েছে।
সরকারি হিসাবে প্রতিটি সিসি ক্যামেরার দাম এক হাজার ৫০০ টাকা, পাওয়ার অ্যাডাপ্টারের দাম ২৮০ টাকা ও ৫০০ জিবি হার্ডড্রাইভের দাম এক হাজার ৯০০ টাকা ধরা হয়েছে। অথচ স্থানীয় আইটি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, যে মানের সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, তার দাম প্রায় ৭০০ টাকা, পাওয়ার অ্যাডাপ্টারের দাম ১২০ টাকা। একই মানের ৫০০ জিবি হার্ডড্রাইভ এক হাজার ৩০০ টাকায় বাজারে পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, ৩৫টি ভোটকেন্দ্রে যে মানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর মোট বাজারমূল্য সাড়ে ৪ লাখ টাকার বেশি নয়। সে হিসাবে এখানে প্রায় ৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
বরিশাল কম্পিউটার এক্সপার্টের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রহিম বলেন, ইউএনভি ব্র্যান্ডের একটি সাদাকালো সিসি ক্যামেরার বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ টাকা। অথচ সরকারি নথিতে এই ক্যামেরার দাম এক হাজার ৫০০ টাকা দেখানো হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। উপজেলা প্রশাসনের নথি পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, অধিকাংশ সরঞ্জামের দাম বাজারমূল্যের দুই-তিন গুণ বেশি ধরা হয়েছে। একই মত দেন এমএম কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী মো. শাওন। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের দরপত্র অনুযায়ী একটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ৩২ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ একই মানের যন্ত্রপাতি, আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ও স্থাপন ব্যয় মিলিয়ে এর প্রকৃত বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া উচিত। এর বেশি হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই।
যে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানে এসব স্থাপন করা হয়, সেগুলো হলো–বাদলপাড়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাটাদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চরাদী ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০নং রানীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাগলদি নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ১৩নং বলইকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালেঙ্গা আম্বিয়া খাতুন বালিকা বিদ্যালয়, ৫নং উত্তর কাজলাকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০নং মাহমুদ নাসির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টার, ৪০নং সরসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২২১নং পশ্চিম দুধল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জিরাইল মজিদিয়া আজিজিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসা, ৪৫নং কাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৭নং দক্ষিণ গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪৬নং দুর্গাপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টার, ৫৬নং পশ্চিম ভাতশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হানুয়া পেয়ারপুর সালেহিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ২৪১নং বেগম নুরজাহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮৫নং বাগদিয়া মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮৬নং ক্ষুদ্রকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯৫নং খয়রাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরসমসদী বালিগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১০৬নং দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টার, ১৫২নং বিহারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২২নং দাওকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টার, ১১৬নং আউলিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোয়ালিয়া জেএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাখরকাঠী-ইমামকাঠী-তরিরকাঠী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুহাম্মদিয়া কামিল (মাস্টার্স) মাদ্রাসা, বড় রঘুনাথপুর ছালেহিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ১৪০নং কাফিলা পল্লী মঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাফিলা রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামনগর আবদুর রশিদ খান জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪৫নং রুপারঝোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০১নং মধ্য নিয়ামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গত কয়েকদিনে আউলিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোয়ালিয়া জেএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাখরকাঠী-ইমামকাঠী-তরিরকাঠী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দাওকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেন্টারে যান এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, অধিকাংশ সিসি ক্যামেরাই অকার্যকর। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ক্যামেরাগুলো বিকল হয়ে যায়। এরপর সেগুলো আর মেরামত করা হয়নি।
বাখরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হ্যাপি আক্তারের ভাষ্য, বিকল ক্যামেরাগুলো মেরামতে প্রায় ৮ হাজার টাকা প্রয়োজন। এ খাতে কোনো বরাদ্দ না থাকায় মেরামত সম্ভব হয়নি।
দাওকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওহাব বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত ৬টি ক্যামেরার মধ্যে ৩টি বিকল হয়ে আছে। যেগুলো সচল, সেগুলোতে পরিষ্কার দেখা যায় না। যে কারণে এগুলো বিদ্যালয়ের কোনো কাজে আসছে না।
বাকেরগঞ্জের আইটি অভিজ্ঞ মেহেদি হাসান বলেন, এখানে নিম্নমানের ও কম দামের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ ক্যামেরা অচল হয়ে পড়ে। সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হলে নির্বাচন শেষেও বিদ্যালয়ের নিরাপত্তায় এসব ক্যামেরা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেত।
এ বিষয়ে গত বুধবার কথা হয় বাকেরগঞ্জের নির্বাচনকালীন ইউএনও রুমানা আফরোজের সঙ্গে। তিনি এখন ভোলার চরফ্যাসনে কর্মরত। রুমানা আফরোজের দাবি, তিনি এ বিষয়ে অভিজ্ঞ নন, তাই ক্যামেরার মান যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ক্যামেরাগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে দামের বিষয়েও অবগত নন। বেশি দামে কেনা দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
বাগেরগঞ্জের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন চন্দ্র পালের ভাষ্য, ঘটনাটি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগের। তাই এ বিষয়ে জানেন না। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুন খন্দকার গতকাল শনিবার সমকালকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমি বরিশালের জেলা প্রশাসক ছিলাম না। তবে আমার জানা মতে নির্বাচনের সময়ে এসব বরাদ্দ সরাসরি উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ইউএনও বরাবর দেওয়া হয়। এসব কেনাকাটার সঙ্গে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তারপরেও কেনাকাটার বিষয়ে যদি অভিযোগ ওঠে, আমরা তা খতিয়ে দেখব।’