Image description

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ঋণ কেলেঙ্কারির পুরনো বিতর্কে নতুন করে এসেছে মো. সাহাবুদ্দিনের নাম। বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমকে সহযোগিতার অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন তিনি। হাইকোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি তদন্ত প্রতিবেদন ও একটি অডিট রিপোর্টে মিলেছে জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষায় তার সরাসরি ভূমিকার তথ্য।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি থেকে নেওয়া ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থ ব্যবহার করে ব্যাংকটির ৮২ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা বনে যাওয়ার বিষয়ে চাওয়া হয় তদন্ত। এই রিটের প্রাথমিক শুনানি করে গত বছরের অক্টোবরে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এতে ওই ২৪ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার ওপর তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয় বিএফআইইউকে।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে ৪২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন ও একটি অডিট রিপোর্ট জমা দেয় বিএফআইইউ। তাতে উঠে এসেছে ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা তথ্য।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়, ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ব্যাংক কোম্পানি আইনের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ওই সময় এস আলমের যে প্রতিষ্ঠানগুলো এই শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়, সেগুলোর অন্যতম জেএমসি বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম।

‘জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে সাহাবুদ্দিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে। পরে ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সরে দাঁড়ান ওই পদ থেকে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন ২০১৭ সালের ৮ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত’— উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।

রিট আবেদনে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধিত্বকারী একজন সিনিয়র আইনজীবী বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করে আগামীর সময়কে বলেছেন, সাহাবুদ্দিন যে সময় পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন, তখন এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ।

‘জেএমসি বিল্ডার্সের পেইডআপ ক্যাপিটাল মাত্রা ১০ কোটি টাকা হলেও ইসলামী ধারার একটি ব্যাংক থেকে শেয়ার কিনেছে ১০২ কোটি টাকার। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ব্রোকারেজ হাউজের ০৩৩১ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৮১২টি শেয়ার কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি’— তথ্য মিলল অডিট প্রতিবেদনে।

এসব শেয়ার কেনার অর্থের উৎস অনুসন্ধান করে বিএফআইইউ দেখতে পায়, টাকাগুলো এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেটে লিমিটেডের হিসাব থেকে এসেছে। অর্থাৎ তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল জেএমসি বিল্ডার্সের শেয়ার কেনার অর্থ। রিট মামলাটি হাইকোর্টে এখনো বিচারাধীন, চলছে শুনানি। আগামী বুধবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য আছে বলেও জানা গেছে।

মামলাটির একটি পক্ষ ইসলামী অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর (আইইআরবি)’ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির আগামীর সময়কে জানালেন, বিএফআইইউর প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পরিচালক হয়েছিলেন এস আলমের লোক হিসেবে এবং এস আলমের সব কেলেঙ্কারির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতাও স্পষ্ট।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হলেও সাহাবুদ্দিন কোনো অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ছাড় পাবেন না বলে দাবি এই আইনজীবীর। ‘সংবিধান অনুসারে শুধু রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় কিছু বিষয়ে ছাড় পেয়ে থাকেন তারা। কিন্তু পদ থেকে সরে গেলে দুর্নীতি বা অন্য যেকোনো অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এতে কোনো সমস্যা নেই’— আইন দেখালেন তিনি।