রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে সংলগ্ন টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে শত শত বহুতল ভবন। বছরের পর বছর ধরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এসব স্থাপনা উচ্ছেদে চিঠি দিলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সময়মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় ৩৬ জনের মৃত্যুর এক বছর পরও বাস্তব চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, গত এক দশকে বিমানবন্দর এলাকার উচ্চতা-সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ৬৪০টিরও বেশি ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা ২০১৫ সাল থেকে তৈরি বেবিচকের নথিতে, তেজগাঁও ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশে এরকম অন্তত ৩২৫টি স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১৭৮টি আবাসিক ভবন, ১২১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ১১টি সরকারি ভবন, ৫টি হাসপাতাল, ৫টি হোটেল এবং ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
স্থাপনাগুলোর মধ্যে ২০২টি তেজগাঁও বিমানবন্দরের এবং ১২৩টি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুরক্ষিত আকাশসীমার ভেতর গড়ে উঠেছে।
নথিতে দেখা যায়, মাইলস্টোনের দুর্ঘটনার ঠিক আগের কয়েক মাসেও রাজউককে একাধিকবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিল বেবিচক। গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যেই অন্তত ছয়টি চিঠির মাধ্যমে ১৭টি অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
গত বছরের ১৬ জানুয়ারি পাঠানো চিঠিতে তেজগাঁও বিমানবন্দরের ফানেল জোনে (বিমান ওঠানামার প্রধান পথ) নিয়ম ভাঙায় উত্তর কাফরুলের তিনটি আবাসিক ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকায় ২০ ফুট উঁচু একটি ভবন তোলা হয়েছে। আর বাকি দুটি ৫৫ ফুট উঁচু ভবন তাদের অনুমোদিত সীমার চেয়ে যথাক্রমে ৪৯ ফুট ও ৪৪ ফুট বেশি উঁচু।
একইভাবে ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল বেবিচক তেজগাঁও বিমানবন্দরের নির্ধারিত উচ্চতার সীমার চেয়ে ৫০ ফুট বেশি উঁচু একটি হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজউককে চিঠি দেয়।
এরপর ১ মে আরেকটি চিঠিতে জানানো হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আরেকটি হোটেল নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৩০ ফুট বেশি উঁচু।
২১ মে বেবিচক উত্তরার বাউনিয়া এলাকার ছয়টি আবাসিক ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজউককে চিঠি দেয়। ভবনগুলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফানেল জোনের বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছে।
এর মধ্যে তিনটি ভবনের উচ্চতা যথাক্রমে ৪৭, ৬৮ ও ৮৭ ফুট, যদিও সেগুলোর উচ্চতা ১৮ ফুটের নিচে থাকার কথা ছিল।
২০২৫ সালের ৩ জুন আরেকটি চিঠিতে উত্তরা-১২ এলাকায় আরও ছয়টি আবাসিক ভবনের কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে তিনটির উচ্চতা ৭০ থেকে ৮০ ফুট, যদিও সেখানে অনুমোদিত উচ্চতা ছিল মাত্র ১৭ থেকে ১৯ ফুট।
তবে নিয়ম ভেঙে কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনের কথা অস্বীকার করেছেন রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, নকশা অনুমোদনের সময় বেবিচকের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়েছিল। মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে ডেভেলপার বা মালিকরা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে আরও কয়েক তলা বেশি উঁচু করার পর।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কয়েকটি এলাকায় বেবিচকের নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী রাজউক ৪৫ ফুট পর্যন্ত ভবনের অনুমোদন দিলেও পরে মালিকরা অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করেছেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, রাজউকের তদারকি ও আইন প্রয়োগে ঘাটতি থাকতে পারে।
এদিকে একের পর এক সতর্কবার্তা পাঠানোর পরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম খেদ প্রকাশ করে বলেন, বেবিচকের চিহ্নিত ভবনগুলোর বিরুদ্ধে রাজউক কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তার কোনো হালনাগাদ তথ্য তারা পাননি। ফলে পাইলটদের জন্য নিরাপদ উড্ডয়ন নিশ্চিত করতে যে 'অবস্ট্যাকল ডাটাবেস' প্রয়োজন, তা হালনাগাদ রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বেবিচক।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজউক ও বেবিচক এখন একটি যৌথ জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে অবৈধ ভবন শনাক্তের কাজ শেষ হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনুমোদিত ও বিপজ্জনক অংশগুলো ভেঙে ফেলা হবে।

কী কী বিধিনিষেধ রয়েছে
বিমানবন্দরের অবস্ট্যাকল লিমিটেশন জোনে কোনো ভবন নির্মাণ করতে হলে বেবিচকের কাছ থেকে উচ্চতা-সংক্রান্ত ছাড়পত্র নিতে হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জোনিং মানচিত্র অনুযায়ী, সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা হলো ফানেল জোন, অর্থাৎ বিমান ওঠানামার পথসংলগ্ন আকাশসীমা। এখানে ভবনের উচ্চতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা।
ফানেল জোন তিন ভাগে বিভক্ত—রেড জোন, ইনার অ্যাপ্রোচ এলাকা ও আউটার অ্যাপ্রোচ এলাকা।
রেড জোনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই। এর পরের অংশ হলো ইনার অ্যাপ্রোচ এলাকা। এখানে রানওয়ে থেকে প্রতি ৫০ ফুট দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে ভবনের অনুমোদিত উচ্চতা ১ ফুট করে বাড়ে।
রানওয়ে থেকে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটারের বেশি দূরে হলে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫০ ফুট (প্রায় ১০ থেকে ১৩ তলা) পর্যন্ত হতে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উত্তর পাশে এই ইনার অ্যাপ্রোচ এলাকা শুরু হয়েছে জসীমউদ্দীন রোড থেকে। এটি উত্তরা ১৪ ও উত্তরা ১২-এর প্রায় পুরো এলাকা, প্রিয়াঙ্কা সিটি, সোনারগাঁও জনপথ সড়ক, রূপায়ণ সিটি উত্তরা হয়ে তুরাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
অন্যদিকে দক্ষিণ পাশে এই এলাকা শুরু হয়েছে জামতলা থেকে। এরপর এটি নিকুঞ্জ, জোয়ারসাহারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এ, বি, সি ও ডি ব্লক হয়ে ভাটারা ও সোলমাইদ পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইনার অ্যাপ্রোচ এলাকার পর রয়েছে আউটার অ্যাপ্রোচ জোন। এখানে রানওয়ে থেকে দূরত্বের ওপর নির্ভর করে ভবনের উচ্চতা সর্বোচ্চ ৫০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।