গাজীপুরের বাঘের বাজার এলাকার ফমকম ফ্যাশনের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান কাজলের ক্যারিয়ার হঠাৎ করেই থেমে গেছে। গত ২৮ জুন ছুটি ঘোষণার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণা তাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তার ছয় বছরের বড় সন্তান বর্তমানে স্কুলে পড়ছে, আর চার বছর বয়সী ছোট সন্তানের লেখাপড়ার জন্য রাখা হয়েছে গৃহশিক্ষক। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিটি দিন কাটছে আতঙ্ক আর হতাশায়। আমি, আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান—আমরা চারজনই এখন চরম দুর্দশার মধ্যে পড়ে গেছি।’
ফমকম ফ্যাশনের বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই সপ্তাহে গাজীপুরের আরও ১৩টি পোশাক কারখানার দরজায় তালা ঝুলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে হিসাব করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
১৯৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত যে ধারাবাহিক সাফল্যের গল্প লিখে আসছিল, গত দুই বছরে তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা।
বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সদস্য ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর ৩৫টি এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আটটি কারখানা রয়েছে। বাকি ১৯টি কারখানা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
তবে বিজিএমইএর নিজস্ব হিসাব বলছে, গত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে চাকরি হারানো শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসের আরেকটি বড় সাফল্যের গল্প তৈরি করেছিল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে। সেই শিল্পের কারখানাগুলোতে একের পর এক আলো নিভে যাওয়া তাই সেই গল্পের মাঝখানে বড় ধাক্কার মতো।
২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।
দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতিও প্রতিকূল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশে আরও অন্তত ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গভীর সংকট, নেই সহজ সমাধান
ফমকম ফ্যাশনের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের ১৭ বছরের কর্মজীবনে প্রথমবারের মতো এমন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
পোশাক খাতের শ্রমিকরা প্রায়ই বকেয়া বেতন, অধিকারবঞ্চনা ও হঠাৎ ছাঁটাইয়ের সমস্যায় পড়লেও এতদিন এসব পরিস্থিতি তার জীবনে প্রভাব ফেলেনি। তাই এমন আকস্মিক ধাক্কার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা একসঙ্গে আন্দোলন করে নিজেদের দাবি জানাতে পারে। আমরা কী করতে পারি? আমরা সংখ্যায়ও কম। শুনেছি শ্রমিকদের পাওনা হয়ত ২০ বা ২৩ জুলাই দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কপালে কী আছে জানি না। তিন মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। অন্যান্য পাওনাও বাকি। আমাদের জন্য কিছু করা যায় কি না-একটু সাহায্য করুন।’
নতুন চাকরির সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুযোগ খুবই সীমিত। একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘হয়ত বাড়ি ফিরে যেতে হবে অথবা সম্পদ বিক্রি করতে হবে। জীবন আর আগের মতো থাকবে না।’
পোশাক শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেক শ্রমিকের পাঠানো অর্থে গ্রামের পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খরচ চলে। নিজেদের ঘর তৈরির স্বপ্ন থাকলেও এই সংকটে টিকে থাকার মতো সঞ্চয় নেই অনেকের।
বন্ধ হয়ে যাওয়া লিথি গার্মেন্টসের শ্রমিক মনির হোসেন বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি খুঁজছি, কিন্তু কোথাও কাজ পাচ্ছি না।’
প্রতি সপ্তাহেই বন্ধ হচ্ছে কারখানা
দেশের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক শিল্পকেন্দ্র গাজীপুরে একের পর এক কারখানার গেটে ঝুলছে ‘বন্ধ’ নোটিশ।
চলতি মাসের অর্ধেক সময়ও পার হওয়ার আগেই ১৫টির বেশি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে হাজারো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা জানেন না কীভাবে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালাবেন।
গাজীপুর সদরের বাঘের বাজার এলাকায় লিথি গ্রুপের পাঁচটি শিল্প প্রতিষ্ঠান—অ্যাপারেল-২১, ফমকম ফ্যাশন, ফমকম ডাইং, ফমকম প্রিন্টিং ও ফমকম নিটিং লিমিটেড—একসঙ্গে বন্ধ হয়েছে।
গ্রুপটির এক ব্যবস্থাপক জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
বোর্ড বাজার এলাকায় ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। আন্দোলনের পর তাদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা হলেও নতুন চাকরির নিশ্চয়তা নেই।
ফমকম ফ্যাশনের চাকরি হারানো শ্রমিক ফারুক হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করছি, কিন্তু কোথাও কাজ পাচ্ছি না।’
একই দিনে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস, অ্যাপেক্স টেক্সটাইল প্রিন্টিং মিলস, অ্যাপেক্স লন্ড্রি মিলস ও অ্যাপেক্স ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডেও তালা ঝুলতে দেখা যায়।
এ ছাড়া কদ্দা-নাওজোর এলাকার ফ্যাশন লিংকার্স এবং কাশিমপুর এলাকার কর্টেক্স অ্যাপারেলসও সম্প্রতি বন্ধ হয়েছে।
গত ১১ জুলাই কালিয়াকৈরের শালিপুর এলাকার রতনপুরে করণী ফ্যাশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেখানে কর্মরত ছিলেন ৮ হাজার শ্রমিক।
একটি কারখানা বন্ধ হওয়া শুধু শ্রমিকদের চাকরি হারানো নয়; এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় দোকান, পরিবহন, বাড়িভাড়া, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার ও ছোট ব্যবসার ওপরও।
নিডল ওয়ার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুর রহমান অপু বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছেন।’
দারিদ্র্য বৃদ্ধির সতর্কতা ইউনিসেফের
ইউনিসেফের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ও দরিদ্র পরিবারের শিশুরা’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরের দেশগুলোর শিশুরাও এই সংঘাতের মূল্য দিচ্ছে। দ্রুত বাড়তে থাকা খরচের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে শিশুদের খাবার ও শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।
ইউনিসেফ দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। তুলনামূলক কম ক্ষতিকর পরিস্থিতিতেও বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে, যেখানে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশ প্রভাব পড়তে পারে।
ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে অর্জিত উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং লাখো শিশুর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।