Image description

টানা বৃষ্টিতে তৈরি হয়েছিল জলাবদ্ধতা। তা পেরিয়ে, হাঁটুপানি ডিঙিয়ে, নৌকায় চেপে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের। কেন্দ্রে যাওয়ার পথে পরীক্ষার্থীদের এমন ভোগান্তির কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরু হয় আলোচনা, সমালোচনা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেন পরীক্ষা স্থগিত হলো না, সে প্রশ্নও যেমন ওঠে, শিক্ষামন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে শিক্ষার্থীরাও হয়ে ওঠেন বিক্ষুব্ধ।

পুরো পরিস্থিতির জন্য শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে দায়ী করে তার পদত্যাগ চাইতে শুরু করেন তারা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ— আন্তঃশিক্ষা বোর্ড বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিতের পক্ষে ছিল। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত বা বাতিলের মূল ক্ষমতা আসলে কার? শিক্ষা বোর্ডের নাকি মন্ত্রণালয়ের?

শিক্ষা বোর্ডগুলোর আইন ও অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরীক্ষা নেওয়া, স্থগিত, বাতিল, এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশের সর্বময় ক্ষমতা তাদের হাতেই। কিন্তু বাস্তবে বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্ত কার্যত নির্ভর করে মন্ত্রণালয়ের সম্মতির ওপর। আইনে মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও প্রশাসনিক বাস্তবতা, মাঠ প্রশাসনের সমন্বয় এবং বদলি-পদায়নের মতো বিষয় বোর্ডের স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে।

শিক্ষা বোর্ড পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯৬১ সালে বোর্ডগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত বা অটোনোমাস বডি হিসেবে স্পেশাল অর্ডিন্যান্স তৈরি করে। সেখানে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া, স্থগিত করা, ফল প্রকাশ বা বাতিল করার ক্ষেত্রে বোর্ডকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা বা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার আইনি অধিকার দিয়েছে অর্ডিন্যান্সের ২, সাব-সেকশন (২-এ)-এ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে ইন্টারমিডিয়েট ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের বা এর যেকোনো পর্যায়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব না হলে সেই পরীক্ষা স্থগিত করা যাবে।’

 

বিষয়টি নিয়ে জানতে আগামীর সময় কথা বলেছে একাধিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে। তারা জানালেন, সোমবারের পরীক্ষা নিয়ে আগের দিন রবিবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের একটি সমন্বয় সভায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা না নেওয়ার পক্ষে মত দেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর মন্ত্রণালয় বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করে সোমবার পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে মত দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষা বোর্ডের হাতে একক ক্ষমতা থাকার পরও কেন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হলো কেন?

এমন প্রশ্নে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক একজন চেয়ারম্যান বললেন, ‘শিক্ষা বোর্ড নামে স্বায়ত্তশাসিত। প্রশাসনিক যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হয়। এ ছাড়া বোর্ডে ডেপুটেশনের আসা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বদলি পদায়ন করে থাকে মন্ত্রণালয়। চাইলে একজন চেয়ারম্যান তার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করার ক্ষেত্রে সবসময় মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’

এমন একটি ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষা চলার সময়। ওই বছর ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক হতাহত হয়। সরকার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। শোকের দিন হওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের প্রস্তাব দেয় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। সেই প্রস্তাব নাকচ করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তৎকালীন শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের। এমন সিদ্ধান্তের জেরে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে রাত ২টায় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন। পরের দিন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সচিবালয় ঘেরাও করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। তাৎক্ষণিক সিদ্দিক জুবায়েরকে অপসারণ করে সরকার।

বোর্ডের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানালেন, যদিও বোর্ড আইনে বোর্ডকে পরীক্ষা স্থগিতের ক্ষমতা দেওয়া আছে, তবুও ‘কন্ট্রোলিং বডি’ হিসেবে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হয় এবং মৌখিক সম্মতি নিতে হয়। সোমবারের পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছিল কিন্তু মন্ত্রণালয় তাতে সায় না দিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে বলে।

যদিও আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আখতারুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘আইনে ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার মতো জনবল আমাদের নেই। স্থানীয় প্রশাসন যেমন— পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। এজন্য আমাদের মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হতে হয়। স্বায়ত্তশাসিত বডি বাংলাদেশ কীভাবে চলে তা সবাই জানে।’

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বললেন, ‘পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা বোর্ডের থাকলেও তা বাস্তবায়ন করতে হয় মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে। জেলা প্রশাসন ও ইউএনওর রিপোর্টের ভিত্তিতেই বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রণালয় তাদের কন্ট্রোলিং বডি হওয়ায় তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত জানাতেই হয়।’

আইনে যা আছে:

শিক্ষা বোর্ডগুলো আইন ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ (ইস্ট পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স নং ৩৩, ১৯৬১ এবং ১৯৭৭ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশ) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শিক্ষা বোর্ডগুলো বিশেষ অ্যাক্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত ১৮(২)(৬) ধারা অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা অনুষ্ঠান, পরিচালনা এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ ক্ষমতা বোর্ডের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। অধ্যাদেশের ১২(৬) ধারা অনুযায়ী, প্রশাসনিক কাজে কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হলে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়লে, চেয়ারম্যান তার বিবেচনা অনুযায়ী যেকোনো ব্যবস্থা (যেমন পরীক্ষা স্থগিত) গ্রহণ করতে পারেন। তবে এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী বোর্ডের সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হয়। কোথাও মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে তা বলা নেই।

অধ্যাদেশের ১২(৬) ধারা অনুযায়ী, প্রশাসনিক কাজে কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হলে এবং যার কারণে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে তখন চেয়ারম্যান তার বিবেচনা অনুযায়ী যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। তবে এ ধরনের জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পর তিনি পরবর্তী বোর্ডের সভায় তা অনুমোদনের জন্য আবেদন বা জমা দেবেন।

করোনাকালে যে আইনে ‘অটো পাস’ দেওয়া হয়:

২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষা বোর্ডগুলো ২০২১ সালের সংশোধিত অধ্যাদেশের ধারা ২(২এ)-এর ক্ষমতা ব্যবহার করে এসএসসি ও জেএসসি/সমমান পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করে, যা অটো পাস হিসেবে পরিচিত পায়। ব্রিটিশ আমলে করা ১৯৬১ সালের মূল অর্ডিন্যান্সটি ২০২১ সালে সংশোধন করা হয়। সেই সংশোধিত আইনে পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়ন বা অটো পাস দেওয়া সম্ভব হয়।

অর্ডিন্যান্সের ধারা ২, সাব-সেকশন (২-এ)-তে বলা হয়েছে— মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে ইন্টারমিডিয়েট ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের বা এর যেকোনো পর্যায়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব না হলে সেই পরীক্ষা স্থগিত করা যাবে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়ন এবং সনদ দেওয়া যাবে কিংবা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া যাবে। এই আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করেই করোনাকালীন পরীক্ষা না নিয়ে অটো পাস, পরবর্তী দুই বছর সাবজেক্ট ম্যাপিং এবং অর্ধেক বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশে আরও বলা আছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে সনদ দিতে পারবে কিংবা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিতে পারবে।