রাত তখন ৯টা পেরিয়েছে। সদরঘাটগামী যাত্রীদের জন্য এ যাত্রা এক অনিশ্চিত সম্ভাবনার। যিনি বাসে উঠেছেন সেটি আদৌ তার গন্তব্যে পৌঁছাবে, নাকি থেমে যাবে এর আগেই! মিরপুর, চন্দ্রা, সাভার ও এয়ারপোর্ট থেকে সদরঘাট রুটে চলাচলকারী লোকাল বাসগুলোর অধিকাংশই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাচ্ছে থেমে। শেষ স্টপেজে আসার আগেই গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার মোড়ে এসে ঘুরে যাচ্ছে বাসগুলো। যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েই শুরু হচ্ছে বাস ঘোরানোর তোড়জোড়।
অনেক সময় বিকালে বা সন্ধ্যায়ও ঘটে এ ঘটনা। তবে এ চিত্র মূলত শুরু হয় রাত ৮টার পর থেকে। ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে চালকরা যাত্রীদের নামিয়ে মোড়টিতে নিতে চান ইউটার্ন। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল দেন লোকদেখানো বাধা। সঙ্গে সঙ্গেই বাসের কন্ডাক্টর বা চালকের সহকারী (হেলপার) বের হয়ে এগিয়ে যায় সেই কনস্টেবলের দিকে। গিয়ে হাতে গুঁজে দেয় ৫০ টাকার একটি নোট। কত টাকা দিতে হবে সেটি সব কন্ডাক্টর বা হেলপারের আগে থেকেই জানা। টাকা পাওয়ার পরই ট্রাফিক কনস্টেবলের সহায়তায় বাসগুলো অনায়াসেই নিয়ে নেয় ইউটার্ন। সেখান থেকেই ফিরতি যাত্রায় ফের তোলা শুরু করে যাত্রী।
গাজীপুর থেকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনে চড়েছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ। গন্তব্য সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, সেখান থেকে যাবেন বরিশাল। সঙ্গে দুটি ভারী ব্যাগ। কিন্তু গুলিস্তানে এসেই কন্ডাক্টর তাকে বাধ্য করেন নেমে যেতে। একরাশ হতাশা নিয়ে ফরহাদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘সদরঘাট পর্যন্ত ভাড়া দিয়েছি কিন্তু গুলিস্তানে নামিয়ে দিল। ১০ টাকা ফেরত চাইলে কন্ডাক্টর তাও দেয়নি। এখন এই মালামাল নিয়ে ভিড়ের মাঝে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।’
একইরকমটি ঘটেছে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী স্বর্ণা দাশের ক্ষেত্রেও। বাড্ডা থেকে রায়সাহেব বাজার যাওয়ার জন্য বাসে উঠলেও তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় গুলিস্তানে। স্বর্ণা বলছিলেন, ‘অফিস শেষে বাস পাল্টানোর মতো এনার্জি আর থাকে না। সরাসরি বাসার সামনে যাওয়ার জন্যই বাসে উঠেছিলাম কিন্তু মাঝপথে এভাবে নামিয়ে দেওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। রিকশায় নবাবপুরের ভেতর দিয়ে যাওয়াও ঝুঁকি, কিছুদিন আগেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।’
একাধিক যাত্রী জানালেন, শুধু এই রুটেই নয়, আরও বেশ কয়েকটি রুটের বাস রাত হলেই শেষ স্টপেজে যাওয়ার কথা বলে তুললেও পরে আর যায় না। এতে করে নিরাপত্তা শঙ্কা ও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
মাঝপথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পেছনে পরিবহনকর্মীরা দিচ্ছেন খোঁড়া যুক্তি। সদরঘাট রোডের যানজট ও মালবাহী পরিবহনের চাপ এড়ানোর অজুহাত তাদের। ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের কন্ডাক্টর মো. নাঈম নিজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেন এভাবে, ‘এসব এলাকায় এলে যাত্রী কমে যায়, তাই অনেক সময় আর যেতে চাই না। তবে যাত্রীরা পুরো ভাড়া দিলে পরে চাইলে ফেরত দিই।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের একটি বাসের চালক তুলে ধরলেন আসল চিত্র। বললেন, ‘রাতে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি ট্রান্সপোর্টে (মালামাল পরিবহনের ভারী যান) ভরে যায়। রাত হলেই রাস্তাটিতে জ্যাম লেগে থাকে। এতে ১৫ মিনিটের রাস্তা যেতে কখনো কখনো এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়।’
‘শেষ স্টপেজে গেলে আবার সিরিয়ালে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। এতে আমাদের লস হয়ে যায়। তাই কনস্টেবলের হাতে ৫০ টাকা গুঁজে দিয়ে গুলিস্তান থেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে নিই’— যোগ করলেন এই চালক।
এমন অনিয়মের পক্ষে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবলরা গাইলেন অদ্ভুত সাফাই। সম্প্রতি এ প্রতিবেদক একাধিক দিন রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার মোড়ে টাকার বিনিময়ে নিয়ম ভেঙে ইউটার্ন নেওয়ার চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল মজিবুর, নাদিরুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজনকে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কাজ তদারকি করতে দেখা যায়। কিছু সময় বেশ কড়াকড়ি থাকলেও পরক্ষণেই তারা হয়ে যাচ্ছিলেন শিথিল।
আজমেরী গ্লোরী, সাভার পরিবহন, তানজিল পরিবহন, ভিক্টর ক্লাসিক ও বিহঙ্গ পরিবহনের অনেক বাসকেই দেখা গেল শেষ স্টপেজে না গিয়ে গোলাপ শাহ মাজার মোড় থেকে ইউটার্ন নিতে। সবচেয়ে বেশি বাস ঘুরিয়ে নিতে দেখা গিয়েছে ভিক্টর ক্লাসিক ও আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের বাসগুলোকে। সেসব বাসের কন্ডাক্টররা বাস থেকে নেমে সরাসরি চলে যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবলের কাছে। গিয়ে তাদের হাতে বা পকেটে গুঁজে দিচ্ছে ৫০ টাকার একটি করে নোট। বিনিময়ে পাচ্ছে গাড়ি ঘোরানোর সুযোগ।
দায়িত্বরত কনস্টেবল নাদিরুজ্জামানের কাছে এমন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে অদ্ভুত সাফাই গেয়ে বললেন, ‘আমরা তো কাউকে নিজে থেকে ঘুরিয়ে দিতে বলছি না। চালকরাই জোর করছে। দেখছেনই তো হেলপাররা কীভাবে জোর করছে, আমরা তো নিজে থেকে কিছু করছি না।’
অথচ ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, রুট পারমিট ছাড়া এভাবে মাঝপথে গাড়ি ঘোরানোর অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পুলিশেরই।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক লালবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (ফুলবাড়িয়া জোন) মাহমুদুল হাসানের কাছে। তিনি জানালেন, মাঝেমধ্যে এরকম অভিযোগ পান। কিন্তু পরে সেখানে গিয়ে অভিযোগকারীকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আর টাকা যে নেবে, সে তো স্বীকার করবে না কখনো।
আইন যা বলে
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৮ ও ৭৭ অনুযায়ী, রুট পারমিটের শর্ত লঙ্ঘন করে নির্ধারিত গন্তব্যের আগে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলে অনূর্ধ্ব ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশের উৎকোচ বা ঘুষ গ্রহণ সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।
টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদুল হাসান বললেন, ‘রাস্তা যখন ফাঁকা থাকে তখন অনেক সময় তারা গাড়িগুলো ঘোরাতে দেয়। এ সুযোগটা কিছু কনস্টেবল নিতে পারে।’
রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে নৈশকালীন যাত্রীদের এমন হয়রানি বন্ধে এবং কনস্টেবলদের অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।