Image description

চরম বন্যা পরিস্থিতির কারণে সবার নজর এখন আবহাওয়ার খবরের দিকে। এমন জরুরি মুহূর্তে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২৪ ঘণ্টার জরুরি যোগাযোগ নম্বরে ফোন করলে কোনো আবহাওয়াবিদ নন; অপর প্রান্ত থেকে কল ধরছেন মাসুদ রানা নামের এক বেকার তরুণ! বিগত আড়াই বছর ধরেই তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের ফোন ধরে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় যোগাযোগের জন্য যে নম্বরটি দেওয়া রয়েছে, সেটি আসলে ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার শিমুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মাসুদ রানার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ রানা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘কীভাবে আমার নম্বর আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে জরুরি নম্বর হিসেবে যুক্ত হলো, আমি নিজেও জানি না। গত আড়াই বছর ধরে প্রতিদিন মানুষ আমাকে ফোন করে আবহাওয়ার খবর জানতে চাইছেন। আমিও যথাসম্ভব জবাব দিচ্ছি।’

দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকায় বেশ অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন বলেও জানান এই তরুণ।

দীর্ঘদিন অন্যের ফোন ধরার আক্ষেপ প্রকাশ করে মাসুদ বলেন, ‘আড়াই-তিন বছর ধরে আমি মানুষের ফোন ধরছি। আবহাওয়া অধিদপ্তর যেহেতু আমার নম্বরটি ব্যবহার করেই ফেলেছে, আর আমিও যেহেতু ধৈর্য ধরে সবার কলের জবাব দিয়েছি; তাদের উচিত আমাকে অন্তত একটি চাকরি দেওয়া।’

তিনি জানান, ব্যাপারটির সুরাহা করতে তিনি ঢাকার আবহাওয়া অফিসে যেতে চান, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা আবার কী ভাববেন—সেই ভয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।

 

সাইবার হামলার শিকার গুরুত্বপূর্ণ দুই ওয়েবসাইট

এদিকে ভুল নম্বর দেওয়ার এই চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যেই গতকাল (১০ জুলাই) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের রাডার সাইট ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি বিভাগের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা হয়েছে।

 

হ্যাক হওয়ার পর এই ছবি ওয়েবসাইটে দেখা যায়।

 

আমেরিকান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির সদস্য ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পাশা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, অধিদপ্তরের মূল ওয়েবসাইট সচল রাখা হলেও ভারী বৃষ্টির তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত করতে রাডার সাইটে হামলা চালানো হয়। তিনি সেখানে দুটি স্ক্রিনশটও যুক্ত করেন।

এতে দেখা যায়, অধিদপ্তরের রংপুর রাডার সাইটের তাৎক্ষণিক (লাইভ) তথ্যের বদলে মালয়েশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। অন্যদিকে, পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের সাইট হ্যাক করে বাংলাদেশকে নিয়ে আপত্তিকর বার্তা ও ছবি পোস্ট করা হয়। সেসব বার্তায় ব্যবহার করা শব্দ বিশ্লেষণ করে হ্যাকাররা ভারতীয় হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

 

হ্যাক হওয়ার পর এই ছবি ওয়েবসাইটে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হ্যাকিংয়ের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইটি কর্মকর্তারা ওয়েবসাইট দুটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছেন। এই ওয়েবসাইটগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতেই ওয়েবসাইটের ওই হেল্পলাইনে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক এবং তখনই বেরিয়ে আসে ভুল নম্বর বিভ্রাটের ঘটনাটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্যোগের মতো এমন সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার ঘটনা দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে, একটি সেবামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বছরের পর বছর ধরে একটি অকার্যকর ও ভুল নম্বর রয়ে যাওয়ার বিষয়টি চরম গাফিলতির দৃষ্টান্ত। জরুরি মুহূর্তে কোনো ব্যক্তি জীবনরক্ষাকারী তথ্যের জন্য সেখানে ফোন করে বিভ্রান্ত হলে এর দায় কে নেবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও সাইবার দুনিয়ায় দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যে কাটেনি, এ ঘটনাই তার প্রমাণ।