Image description

চিকিৎসা নিতে গিয়ে কেউ ভুল রক্ত প্রয়োগে জীবন হারাচ্ছেন, কেউ অ্যানেসথেসিয়ার ভুল মাত্রার কারণে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকেই ফিরছেন লাশ হয়ে, আবার চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ-স্যালাইন না দেওয়ার কারণেও কারও নিভছে প্রাণ। এভাবে ন্যূনতম মানদণ্ড, প্রয়োজনীয় জনবল ও কার্যকর তদারকি ছাড়াই বগুড়ার বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের একটি অংশ চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। আর এই বিশৃঙ্খল চিকিৎসা ব্যবস্থার অসীম মূল্য গুনতে হচ্ছে রোগীকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের অলিগলি থেকে উপজেলা পর্যন্ত অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। এর মধ্যে লাইসেন্সহীন কার্যক্রম, লাইসেন্স নবায়ন না করা, নামি চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে রোগী টানা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়াই অস্ত্রোপচার পরিচালনা এবং চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিস্তর অনিয়ম রয়েছে। 

নথিতে ৪৮৬, বাস্তবে ৭০০ 
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়া বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬টি। এর মধ্যে ক্লিনিক ২১৫ আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার ২৭১টি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বগুড়া শহরে এখন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা সাত শতাধিক।  তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন করে না। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১০ প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। 
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, রোগীর চাপ, সহজে ব্যবসার সুযোগ এবং দুর্বল তদারকির কারণে তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ, কোনটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে কিংবা কোথায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম আছে এসব তথ্য তাদের কাছেও নেই।  

স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে চলতি জুন পর্যন্ত জেলার ৭৬টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে বন্ধ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পরে নাম বদলিয়ে, মালিকানা বদলের কৌশলে কিংবা অন্য এলাকায় স্থানান্তর হয়ে আবারও ব্যবসা করছে। 

প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্যসেবা 
বগুড়া শহরে একের পর এক বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের ধরন আলাদা হলেও প্রায় প্রতিটি ঘটনা ঘিরে রয়েছে চিকিৎসায় অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি। সম্প্রতি তিনটি ক্লিনিকে তিনজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা বেশ আলোচিত হয়। শহরের খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে ভুল রক্ত প্রয়োগের অভিযোগে প্রসূতি আফরিন জাহান অহনার মৃত্যু হয়। কানছগাড়ী এলাকার সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় শিশু আব্দুল্লাহ আল আয়ানের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এরপর বাদুড়তলা প্রেসপট্টি এলাকার সারা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টনসিল অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়ার ভুল মাত্রা প্রয়োগের অভিযোগে মারা যান শাপলা বেগম। 

এ ছাড়া ঠনঠনিয়া এলাকার প্রভাতী ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা জবা বালা রানীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। জলেশ্বরীতলার এনাম ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি রোখসানা আক্তার ও তাঁর গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর অভিযোগ আলোচনার জম্ম দেয়। সোনার দেশ ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় উজ্জ্বল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাও শহরবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

একই চিকিৎসক, বহু ঠিকানা 
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শহরের একাধিক নামিদামি ক্লিনিকে রয়েছে একই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম। বাস্তবে অনেকের নাম সাইনবোর্ডসর্বস্ব। শহরের জিবি জেনারেল হাসপাতাল, আল-সাফা জেনারেল হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এলাইড হেলথ কেয়ার, নর্থ বেঙ্গল কার্ডিও ভাস্কুলার অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল, ডক্টর ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মিলেছে এমন চিত্র।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান রতন। শহরের সার্ক জেনারেল হাসপাতাল, সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতাল, সারা হসপিটালসহ ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান তাঁর নাম ব্যবহার করছে। এ ছাড়া নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ ছানাউল ইসলামের নাম রয়েছে একই সঙ্গে জিবি জেনারেল হাসপাতাল, আল-সাফা জেনারেল হাসপাতাল, গ্রীন লাইফ ক্লিনিক ও এলাইড হেলথ কেয়ারে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আমিনুল হাসান রোগী দেখেন জিবি জেনারেল হাসপাতাল ও এলাইড হেলথ কেয়ারে। নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. এম এ ওয়াহেদের নাম পাওয়া গেছে জিবি জেনারেল হাসপাতাল, লাইফ লাইন হসপিটাল, শতদল কমিউনিটি হাসপাতাল, বন্ধন হসপিটাল, 
নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাস্কুলার অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল ও এলাইড হেলথ কেয়ারে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অলোক চন্দ্র সরকারের নাম মিলেছে জিবি জেনারেল হাসপাতাল, সারা হসপিটাল, সার্ক জেনারেল হসপিটাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লাইফ লাইন হসপিটাল, নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাস্কুলার অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল ও এলাইড হেলথ কেয়ারে।
নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নাজমুল হক ইবনে সিনা, নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাস্কুলার অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল, রয়েল হসপিটাল, ডেল্টা লাইফ হসপিটালসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। 

এ ছাড়া ইউরোলজিস্ট ডা. আবেদীন বিল্লাহ, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রোকসানা শারমিন শান্তা, নিউরো সার্জন ডা. মিল্টন কুমার সাহা, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্বপন কুমার সাহা, ডা. সুজন সরকার, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হুর-ই-জান্নাত আফরোজা হক (রীমা), হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফয়সাল ফারুক, চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আলতাফ হোসেন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রীপা কুণ্ডু, নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে বাসক, ডা. মো. আব্দুল হাই, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. অলোক কুমার সরকার এবং প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত শরমিনের নামও একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে পাওয়া গেছে।
সহকারী অধ্যাপক ও সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান রতন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অসাধু প্রতিষ্ঠান মালিকরা আমার নাম ব্যবহার করে ব্যবসা চালাচ্ছে। আগে দুই-একটি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলেও এখন আর যাই না। এসব প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসার ঘটনা ঘটলে আমাদেরও বদনাম হয়। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত শরমিন বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব শেষ করে অবসর সময়ে দুই-তিনটি ক্লিনিকে রোগী দেখি। ক্লিনিক থেকে অন-কল জানানো হলে সেখানে গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি। তবে অনেকে আমার নাম সাইনবোর্ডে ব্যবহার করে।
নর্থ বেঙ্গল কার্ডিওভাস্কুলার অ্যান্ড জেনারেল হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বর হোসেন রাজু বলেন, চিকিৎসকরা তাদের দায়িত্ব শেষ করে অন-কলে এখানে আসেন। রোগীকে আগেই চিকিৎসকের উপস্থিতির তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়।

মানহীন চিকিৎসাসেবা 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে ডিউটি ডাক্তার নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স ছাড়াই রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 
আবার কোথাও অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রম চললেও নেই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি।
শহরের মফিজপাগলা মোড়ের একতা ক্লিনিক বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। সেখানে কাজ করছেন মেডিকেল টেকনোলজিতে পড়া কিছু শিক্ষার্থী। রোগীকে রাখা হয় অপরিচ্ছন্ন কক্ষে। ব্যবহৃত চিকিৎসা সামগ্রী যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। 

ঠনঠনিয়া এলাকার সার্ক জেনারেল হাসপাতাল এবং রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকে লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ দেখা যায়। রোগী ও স্বজনের ব্যবহৃত ওয়ার্ড, টয়লেট এবং চিকিৎসা কক্ষের পরিচ্ছন্নতার অবস্থা বেশ নাজুক। ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ ও চিকিৎসা বর্জ্য খোলা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। 
সার্ক জেনারেল হসপিটালের ডিউটি ডাক্তার মোমিনুর ইসলাম বলেন, আমাদের তিনজন ডিউটি ডাক্তার ও তিনজন নার্স আছেন। লাইসেন্স নবায়নের কাজ চলছে। নার্স তানিয়া আক্তার জানান, নিয়ম অনুযায়ী ছয়জন নার্স থাকার কথা। তিনজন থাকায় তারা একবার জরিমানা গুনেছেন।

শতদল কমিউনিটি হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার রাকিব হাসান বলেন, তিন শিফটে তিনজন ডাক্তার ও তিনজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অন-কল সিস্টেমে রোগী দেখেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, ১০ শয্যার হাসপাতাল বা ক্লিনিকে কমপক্ষে তিনজন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয়জন নিবন্ধিত নার্স, সার্জন, গাইনি বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেসথেটিস্ট থাকার কথা। তবে জেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এই নিয়ম মানে না।

 ছাড়পত্রহীন অধিকাংশ ক্লিনিক 
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ক্লিনিক ও হাসপাতালের ছাড়পত্র প্রতি বছর নবায়ন বাধ্যতামূলক। তবে বগুড়ার পাঁচ শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র ৮০টির। অর্থাৎ প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই। অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি ল্যাব এবং অন্যান্য ইউনিটের রাসায়নিকযুক্ত তরল বর্জ্য শোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও তা কেউ করে না। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র গুরুত্বপূর্ণ। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে। নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালাব।
বগুড়ার সিভিল সার্জন খুরশীদ আলম বলেন, নিবন্ধনহীন যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমাদের তালিকার বাইরে রয়েছে, সেখানে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা রোগী দালালের খপ্পরে পড়ে ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনি ব্যবস্থা নেব।